সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে যাচাই-বাছাইয়ের নামে স্থগিতের সুপারিশ হতাশাজনক। মানবাধিকার পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার, মানুষের সমান অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে বিচারক নিয়োগ এবং স্বাধীন বিচার সচিবালয় সবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এই মৌলিক সংস্কার ক্ষেত্রগুলোকে উপেক্ষা করা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলের জন্য আত্মঘাতমূলক।
বিগত কর্তৃত্ববাদী সময়ের অভিজ্ঞতা দিয়ে যে পথে দেশবাসী এবং এখনকার সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল গেছে, সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা। তারা প্রায় সবাই এই ক্ষেত্রগুলোতে আইনগত দুর্বলতা এবং বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার কমিশনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণের কারণে অকার্যকারিতার শিকার হয়ে বহুমাত্রিক অধিকারহরণের ভুক্তভোগী হয়েছে। কর্তৃত্ববাদ ও রক্তক্ষয়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে যদি তারা কোনো শিক্ষা নিয়ে থাকে, তবে অধ্যাদেশগুলো হুবহু বিল আকারে অবিলম্বে সংসদে অনুমোদনের উদ্যোগ নিয়ে দেশবাসীকে প্রমাণ দেওয়া উচিত। তবে এ ক্ষেত্রে উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে, বাস্তবে সেই শিক্ষা কোথায়?
ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের কথা পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে। তাই এসব বিষয়কে এভাবে অবজ্ঞা করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে—জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য যে মৌলিক সংস্কারগুলো অপরিহার্য, সেগুলো বর্তমান সরকার বা সংসদ কেন উপেক্ষা করছে। যে প্রত্যাশায় তারা সংসদে নির্বাচিত হয়েছে, সেটির সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশ নিয়ে একটা ডিলেমা দেখা দিয়েছে। কারণ, দুদক আইনের সংশোধনের জন্য প্রণীত অধ্যাদেশে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। অধ্যাদেশ প্রণয়নের সময়ই আমরা সেগুলো নিয়ে কথা বলেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, তারা একসময় রাজিও হয়েছিল। কিন্তু পরে সরে এসেছে, কারণ ভেতর থেকে এবং আমলাতন্ত্র থেকে প্রতিরোধ ছিল।
এখন সেই অবস্থা পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, দুদক সংস্কারের অধ্যাদেশটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। তাই আপাতত এটিকে স্থগিত করার বিষয়ে আমি একমত। কিন্তু স্থগিত করাটা যেন চিরস্থায়ী না হয়ে যায়।
দুদক সংস্কার কমিশনের যে প্রস্তাবগুলোতে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল সম্পূর্ণ একমত ছিল, কোনো নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং জুলাই সনদের বাইরেও দুদক-সংক্রান্ত অনেক প্রস্তাবে সব দল একমত ছিল—এগুলোকে মানদণ্ড করে অংশীদারদের সম্পৃক্ত করে অবিলম্বে দুদক অধ্যাদেশ সংশোধন করা উচিত। তারপর সেই সংশোধনীর ভিত্তিতে আইনে রূপান্তর করতে হবে।
দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের অবস্থা সৃষ্টি করে সরকার দুদককে অকার্যকর করে রাখল, এতে তারা কী বার্তা দিচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে সরকারের ওপর এখন বিশেষ দায়িত্ব পড়েছে যেন অবিলম্বে অধ্যাদেশটি সংশোধন করে নতুন দুদক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়।
দুদক, পুলিশ কমিশন ও তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ স্থগিতের সুপারিশপ্রাপ্ত বাকি অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সম্পৃক্ত করে যাচাই-বাছাই করে অবিলম্বে আইনে পরিণত করতে হবে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি






