আপনি কি সঠিকভাবে হাইড্রেটেড রাখছেন? অনেকে মনে করেন, যথেষ্ট পানি খেলেই হাইড্রেশন ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু শরীর কোনো জলের ট্যাঙ্ক নয়, বরং একটি সক্রিয় ব্যবস্থা যা ক্রমাগত পানি, খনিজ লবণ ও কোষের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। তাই কেউ কেউ বারবার পানি খেলেও ক্লান্তি বা বুদ্ধিলোপের মতো পানিশূন্যতার সমস্যায় ভোগেন। চিকিৎসকরা বলছেন, শরীরে কত পানি প্রবেশ করছে তা নয়, বরং এটি কতটা ভালোভাবে ধরে রাখছে এবং ব্যবহার করছে, সেটাই মূল বিষয়। হাইড্রেশন হলো সময়োপযোগী পানি গ্রহণ, পুষ্টি ও দৈনন্দিন অভ্যাসের সমন্বয়।
শুধু পানি খেলেই হাইড্রেশন হয় না। কোষে পানি পৌঁছে দিতে ও ধরে রাখতে ইলেকট্রোলাইটের দরকার, বিশেষ করে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন, বেশি করে পানি খেলে তাঁরা হাইড্রেটেড থাকবেন। আদতে হাইড্রেশন শুধু পানির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে আপনার শরীর কতটা কার্যকরভাবে তরল শোষণ করে এবং ব্যবহার করে, তার ওপর। এ কারণেই অনেকে লিটারের পর লিটার পানি খেলেও খাওয়াদাওয়া ঠিক না হলে পানিশূন্যতায় ভোগেন।
খনিজ লবণের অভাবে পানি দ্রুত শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, হাইড্রেশনে সুষম পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, বিশেষ করে পানির ভারসাম্য রক্ষায় ইলেকট্রোলাইটের। অনেকের এক ঢোকে অনেক পানি খাওয়ার অভ্যাস থাকে, বিশেষ করে অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকার পর। এতে তৃপ্তি হয়, কিন্তু পানি পুরোপুরি শোষিত হয় না। শরীর বিভিন্ন পর্যায়ে পানি শোষণ করে। একসঙ্গে অনেক পানি খেলে কিডনি অতিসক্রিয় হয়ে অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়।
পেটে প্রবেশকৃত পানিকে শোষণে সাহায্য করে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও প্রাকৃতিক লবণ। এগুলো কোষে পানির ভারসাম্য রক্ষা করে। কলা, কমলার মতো ফল, পালংশাক, শসার মতো সবজি বা ঘরে রান্না করা খাবার এতে বড় পার্থক্য আনে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু পানিই যথেষ্ট নয়। সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো খনিজ লবণ আপনার শরীরের কোষগুলোতে পানি ধারণ করতে সহায়তা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিচালিত হাইড্রেশন ও পুষ্টিবিষয়ক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কম ফল ও সবজিসমৃদ্ধ খাবার কার্যকর হাইড্রেশনকে বাধাগ্রস্ত করে। অর্থাৎ হাইড্রেশনের শুরুটা হয় প্লেট থেকে, শুধু পানির বোতল থেকে নয়।
সব পানীয় এক নয়। ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল মৃদু মূত্রবর্ধক, যা মূত্রের পরিমাণ বাড়িয়ে শরীরের তরল কমায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কফি ও সোডার মতো পানীয় হাইড্রেশনে সহায়তা করে না, কারণ এসব শরীরে পানি ধরে রাখে না। এর অর্থ এই নয় যে এসব খাওয়া বন্ধ করতে হবে, বরং সতর্কতার সঙ্গে খেতে হবে। এক কাপ কফি খেলে হয়তো কিছু হয় না, কিন্তু পানির বদলে কফি খেলে ধীরে ধীরে শরীর পানিশূন্য হয়।
হাইড্রেশন রুটিনের ওপর নির্ভরশীল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকা, হাঁটাচলা কম, প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া এসব প্রভাব ফেলে। লবণাক্ত বা প্রক্রিয়াজাত খাবার তরলের ভারসাম্য নষ্ট করে, টাটকা খাবারের অভাবে শরীরে পানি কমে। অবসাদও তরল ভারসাম্যকারী হরমোনকে প্রভাবিত করে পানি পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা হ্রাস করে। অনেকে পিপাসা না পাওয়া পর্যন্ত পানি খান না, কিন্তু ততক্ষণে শরীর অনেক তরল হারিয়ে ফেলে। ফলে মাথাব্যথা, ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব দেখা দেয়—যা প্রায়ই পানিশূন্যতার কারণে ঘটে। কাজেই হাইড্রেশন মানে পিপাসা পেলে পানি খাওয়া নয়, বরং পিপাসা না পাওয়াই সঠিক হাইড্রেশন।
শুধু পানি খেলেই চলবে না, অভ্যাস বদলালে হাইড্রেশন উন্নত হয়। সারাদিন অল্প অল্প করে পানি খান, সঙ্গে সুষম খাবার নিন। ফল ও সবজি প্রাকৃতিকভাবে পানি জোগায়, এগুলো বাড়ান। ক্যাফেইন ও অ্যালকোহলে সতর্ক থাকুন। সহজ কথায়, পানি খাওয়া জীবনের অংশ হোক এবং ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করুন। এসব সাদামাটা মনে হলেও কার্যকর, কারণ বিশেষজ্ঞরা শরীরের কার্যপ্রণালী মাথায় রেখে বলেন। সূত্র: ওয়েবএমডি






