ঢাকার মতো মেগাসিটিতে নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনসংকট এক বড় সমস্যা। এর অস্থায়ী সমাধান হিসেবে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসমান হোটেল বা বোর্ডিং দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন স্থাপত্য ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইনের সহযোগী অধ্যাপক স্থপতি ড. সাজিদ বিন দোজা

গুগলে খোঁজ করে দেখলাম, পৃথিবীর আর কোথাও ভাসমান নৌকায় এমন সস্তা বোর্ডিং হোটেলের খবর পাওয়া যায় না। বরং বিলাসবহুল ভাসমান রেস্তোরাঁ ও রিসোর্টের তথ্য এসে পড়ে। গুগলের এক কোণে বিভিন্ন পত্রিকার নিউজ ফিড ও ফিচারে বুড়িগঙ্গার ভাসমান হোটেলের উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক ইউটিউবারও এগুলো কভার করেছেন—সস্তায় বোর্ডিং, রাত কাটানোর আশ্রয় ও নিম্ন আয়ের মানুষের বিশ্রামস্থল হিসেবে।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য এই আশ্রয়ণ ব্যবস্থা চলছে। দিনমজুর, হকার, পান-সিগারেট বিক্রেটা, ফল ব্যবসায়ী ও অন্য শহর থেকে আগত ঠিকানাহীনদের জন্য এটি অস্থায়ী আবাস। ঢাকার আবাসনসংকটে এর ভূমিকা কী? তৃণমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতি এর সংবেদনশীলতা কতখানি? কারিগরি ও টেকসই দিক থেকে কেমন? এসব প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা করেছি এবং সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছি।

১৯৬০-৭০ এর দশক থেকে এই হোটেলগুলো নদীর পাড়ে স্থায়ীভাবে ভাসছে। সাধারণত নির্দিষ্ট স্থানেই থাকে। বুড়িগঙ্গার বাবুবাজার ব্রিজের নিচে একসময় ১০-১১টি বোট ছিল, মুক্তিযুদ্ধের পর সংখ্যা কমে, এখন মাত্র ৫টি: ‘বুড়িগঙ্গা’, ‘উমা-উজালা’, ‘ফরিদপুর মুসলিম হোটেল বোর্ডিং’, ‘শরীয়তপুর’। বেশিরভাগই পুরোনো, তবে নিয়মিত মেরামত করে ব্যবহারযোগ্য রাখা হয়।

এগুলো মূলত পুরোনো লঞ্চ, যারা একসময় নৌরুটে চলাচল করত। যাত্রীবহনের অযোগ্য হওয়ার পর এখন অস্থায়ী আবাসিক হোটেল। অবস্থান সুবিধাজনক—শ্রমজীবীদের কাজের জায়গার কাছে। পাড় থেকে ওঠার জন্য কাঠের সিঁড়ি আছে। বসবাসের মোটামুটি সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

শীতে লেপ, কম্বল, তোশক, বালিশ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা হয়। মিটফোর্ড হাসপাতালের বিপরীতে এক ভাসমান হোটেলের ম্যানেজার জানান, সিঙ্গেল সিটের ভাড়া ৫০ টাকা এবং কেবিনের ১৫০ টাকা। এটি দেশের অন্যান্য আবাসিক হোটেলের তুলনায় অনেক সস্তা।

এক রিকশাচালক বলেন, “বাসাবাড়ি বা হোটেলে থাকার সামর্থ্য আমাদের নেই, আগে রিকশার সিটে রাত কাটাতাম, কিন্তু ভাসমান হোটেলটির সন্ধান পাওয়ার পর থেকে এখানে থাকি।” প্রতি লঞ্চে ৫০ জনের ব্যবস্থা, পাঁচটি বোটে প্রায় ২০০ মানুষ এক ছোট মহল্লা গড়ে তুলেছেন। তারা পারস্পরিক সাহায্য-সমর্থনে জীবন যাপন করছেন। এগুলো ঢাকার অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠেছে।

কেউ কেউ দীর্ঘদিন এখানে। তাই বাসিন্দা-কর্মীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কর্মীরা প্রয়োজনে টাকা ধার দেন, অভাবে বিনা ভাড়ায় থাকার সুযোগ দেন। রাসেল নামের এক অতিথি বলেন, “বেশ কিছুদিন ধরেই এখানে আছি। ঢেউয়ের ওপর নৌকার দুলুনি আমি খুবই উপভোগ করি। টার্মিনাল থেকে যথেষ্ট দূরে হওয়ায় এখানে বেশি শব্দ নেই। বর্ষাকালে সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়, টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনতে পাই।”

খাবারের ব্যবস্থা নেই, অতিথিরা বাইরে থেকে আনতে পারেন। নদীতে দীর্ঘকাল ভাসায় নির্মাণসামগ্রী যথাযথ মানের হওয়া দরকার, রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে রেজিলিয়েন্স নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে বৃষ্টি-ঘূর্ণিঝড়ে নিরাপত্তা যাচাই করা প্রয়োজন।

পরিবেশের উপর প্রভাব বিশ্লেষণ করা দরকার। মলত্যাগ, প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলায় পানি দূষণের ঝুঁকি আছে। স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন গাদাগাদি, নোংরা, শৌচাগার অভাব। তবে কিছু হোটেল জলবাহী টয়লেট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বায়ু চলাচল নিশ্চিত করছে। পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণে উৎসাহ দিতে হবে।

এগুলোকে আরও সফল করা যায়—কক্ষবিন্যাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার উন্নত করে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, স্থায়িত্ব ও রেজিলিয়েন্স বাড়ানোর বৈজ্ঞানিক সমাধান প্রয়োজন।

(লেখাটি মুক্তকণ্ঠের বিশেষ ম্যাগাজিন বর্ণিল বসত ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)