বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষণীয় হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুরা ভিড় করছে। এ বছর হঠাৎ এত বেশি হাম দেখা দেওয়ার কারণ কী? সমস্যা থেকে মুক্তির পথ কোনটি? আগে টিকা নেওয়া শিশুরাও কি আবার টিকা নেবে? বড়রাও কি টিকা নিতে পারবে? অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে কী করা দরকার—এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ডা. তানজিনা হোসেন

হঠাৎ করে এ বছর হামের প্রাদুর্ভাব বেশি হওয়ার কারণ কী?

হামের এই প্রাদুর্ভাবের জন্য কয়েকটি কারণ দায়ী। প্রথমত, সর্বশেষ তথ্যমতে বাংলাদেশে ৮৫ শতাংশ শিশু হামের প্রথম ডোজ টিকা পেয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় বা সম্পূর্ণ ডোজের হার ৮২ শতাংশ।

জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুসারে, কোনো এলাকায় শতভাগ শিশু টিকা নিলে সেই জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে।

আমাদের টিকাদানের হার ৮৫ শতাংশ হওয়ায় ধরা যায়, ৭২.৮ শতাংশ শিশু হামের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি তৈরি করেছে। ফলে বাকি ২৭.২ শতাংশ শিশু নন–ইমিউন রয়ে যাচ্ছে।

দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ শিশুর জন্ম হয়। এর মধ্যে ২৭.২ শতাংশ নন–ইমিউন হলে সংখ্যা হয় প্রতি বছর ৮ লাখ ৪০ হাজার। এটি উপেক্ষণীয় নয়।

এই সংখ্যা বছর বছর বাড়তে থাকলে ৩০ লাখে পৌঁছালে বড় ‘আউটব্রেক’ ঘটবে। সম্ভবত বাংলাদেশ এখন সেই দ্বারপ্রান্তে।

দ্বিতীয়ত, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। দেশের সব সংক্রামক রোগের মধ্যে এর সংক্রমণহার সবচেয়ে বেশি। এক আক্রান্ত শিশু থেকে ১৮টি শিশু আক্রান্ত হতে পারে।

জনবহুল ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমায়, হাম তা আরও হ্রাস করে। ফলে জটিলতা ও মৃত্যু বাড়ছে। তাই এটাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।

এই মুহূর্তে কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে?

এখন শতভাগ শিশুর টিকা নিশ্চিত করতে হবে, যাকে বলে ‘সাপ্লিমেন্টারি ভ্যাকসিনেশন’। আক্রান্ত এলাকা ছাড়াও দেশের ৯৫ শতাংশ জেলায় ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দিতে হবে।

জাতীয় পর্যায়ে নয়, জেলাভিত্তিকভাবে বাড়ি বাড়ি ক্যাম্পেইন চালিয়ে শিশুদের খুঁজে টিকা দিতে হবে। তবেই আউটব্রেক রুখতে পারা যাবে।

যারা আগে টিকা নিয়েছে, তারাও কি আবার টিকা নেবে?

হ্যাঁ, মহামারি ঠেকাতে সব শিশুকে টিকা দিতে হবে। তবে গত এক মাসে টিকা নেওয়া শিশুদের বাদ দিতে হবে। নিয়মিত কর্মসূচিতে ৯ মাসে টিকা দেওয়া হয় যদিও, এই ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ১৫ বছরের নিচে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এ বিষয়ে এখনই সতর্ক পদক্ষেপ না নিলে রোগটি আরও ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। সরকারের উচিত বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের নিয়ে তাৎক্ষণিক পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া।

শিশু ছাড়া বড়রাও কি টিকা নিতে পারবে?

হামের টিকা বড়রাও নিতে পারবেন। তবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম বা ‘ইমিউনোকমপ্রোমাইজড’ ব্যক্তিরা—যেমন ক্যানসার রোগী, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নেওয়া রোগী, এইচআইভি আক্রান্ত বা অন্তঃসত্ত্বা নারীরা নিতে পারবেন না। সন্তান ধারণের ইচ্ছুক নারীরা টিকার অন্তত এক মাস পর চেষ্টা করবেন।

শিশুদের টিকাদানে অভিভাবক ও জনসচেতনতা বাড়ানোর বিষয়ে কিছু বলুন।

অভিভাবকদের বলব, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ও মারাত্মক রোগ। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ধ্বংস করে অন্যান্য রোগের জন্য শরীর উন্মুক্ত করে। ফলে জটিলতা দেখা দিতে পারে।

তাই প্রিয় সন্তানের জন্য হামের টিকায় কোনো অবহেলা করবেন না। গুজব বা অবৈজ্ঞানিক তথ্যে বিভ্রান্ত হবেন না। সচেতনতা বাড়াতে ক্যাম্পেইন ও প্রচারমাধ্যমের ব্যবহার জরুরি।