শিল্পের শক্তি মানুষকে অসুন্দর থেকে সুন্দরের দিকে, ধ্বংস থেকে সৃষ্টির দিকে নিয়ে যায়। শিল্পের শক্তি অবিনাশী। মুক্তকণ্ঠের অগ্নিদগ্ধ ভবনে আয়োজিত শিল্পকর্মে এই অনিঃশেষ শক্তির প্রকাশ ঘটছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পী ও বিদগ্ধজনেরা।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠ ভবনে শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের শিল্প প্রদর্শনী ‘আলো’ দেখতে আসেন দেশের প্রবীণ-নবীন শিল্পী, স্থপতি, সাহিত্যিকসহ বিদগ্ধজনেরা। পরে তাঁরা ইফতার শেষে মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে এক সংক্ষিপ্ত মতবিনিময়ে প্রদর্শনী নিয়ে তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তাঁরা প্রথম আলোর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে হামলার নিন্দা জানান, দোষীদের শাস্তি দাবি করেন।

গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে একদল উগ্রবাদীকে উসকে দিয়ে মুক্তকণ্ঠ ভবনে ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হয়। তারা ভবনে ব্যাপক লুটপাট চালায় ও আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এই ভবন নিয়ে ‘আলো’ নামের প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা ও বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকবে। প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

.

প্রদর্শনীর প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন মুক্তকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। বলেন, এই হামলা ছিল খুবই সুপরিকল্পিত। এর রাজনৈতিক, সামাজিক নানা রকমের তাৎপর্য রয়েছে।

প্রদর্শনী দেখতে আসার জন্য অতিথিদের ধন্যবাদ জানান মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান।

শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান বলেন, ‘ধ্বংসই শেষ নয়। হামলার পরও মুক্তকণ্ঠ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সেই ইতিবাচকতাই আমি প্রদর্শনীতে দেখাতে চেয়েছি।’ মতবিনিময়ে তাঁর স্ত্রী শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপি উপস্থিত ছিলেন।

প্রদর্শনী সম্পর্কে বিশিষ্ট শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সচরাচর যেমন শিল্পপ্রদর্শনী দেখি, এটা তেমন স্বাভাবিক প্রদর্শনী নয়। এটি একটি বাস্তব ঘটনা। বাস্তব উপকরণ ব্যবহার করে করা হয়েছে। কিছু উপকরণ শিল্পী বাইরে থেকে যোগ করেছেন। এর মধ্যে অনেক স্তরের কাজ আছে। অনেক রকম গল্প বলা হয়েছে। শিল্পী খুবই সুন্দরভাবে হামলার বিপরীতে সৃষ্টির শক্তি ফুটিয়ে তুলেছেন।’

.

শিল্পী শহীদ কবির বলেন, একজন শিল্পী কখনো কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করতে পারে না। এই প্রদর্শনীর মধ্যে সে বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রদর্শনী আশাবাদ জাগিয়েছে।

অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, ‘গত দেড় বছরে মব সন্ত্রাস কী দানবীয় চেহারা পেয়েছিল, তার বীভৎস রূপ আমরা দেখতে পেয়েছি মুক্তকণ্ঠের এই অগ্নিদগ্ধ ভবনে এসে। তবে আশার কথা, এখানে শিল্পের শক্তির প্রকাশ ঘটেছে। শিল্পের শক্তি অবিনাশী। তরুণদের এই প্রদর্শনী সব ধরনের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করবে।’

স্থপতি রফিক আজম বলেন, প্রদর্শনীতে উপকরণগুলোর রূপান্তরের বিষয়টি চমৎকারভাবে এসেছে। পুড়ে যাওয়া, ধ্বংসপ্রাপ্ত উপকরণগুলো ব্যবহার করে শিল্পী তার ভেতর থেকেই একটি প্রাণশক্তির জাগরণ প্রকাশ করেছেন। এটা খুব সহজবোধ্যভাবে করা হয়েছে। কোনো অতিরঞ্জন নেই। আর কর্মীদের সাক্ষাৎকারের ভিডিও ব্যবহার করায় পুরো বিষয়টি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, এটা এমন একটা প্রদর্শনী, যা ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন এটি দেখতে পারে।

.

স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম মতবিনিময়ে অংশ নিতে পারেননি। প্রদর্শনী দেখে তিনি বলেন, ‘এটা একটা অপূর্ব প্রদর্শনী। এত দিন আমরা রাস্তায় টায়ার ও গাড়ি পোড়াতে দেখেছি। এখন ভবন পোড়াতে দেখছি। সেটিও আবার দেশের প্রধান গণমাধ্যমের ভবন। এর শেষ কোথায়?’ তিনি বলেন, এই নেতিবাচক শক্তির ভেতর থেকে শিল্পী যে ইতিবাচকতার শক্তির প্রকাশ তুলে ধরেছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শিল্পী ফরিদা জামান বলেন, ‘এই প্রদর্শনীটি সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকল। গণমাধ্যম ও মুক্তচিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে আমাদের দৃঢ় অবস্থান ছিল, থাকবে।’

তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে আর্ক রিপন ও জুয়েল এ রব তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় মুক্তকণ্ঠের প্রতি সংহতি জানান।

প্রদর্শনী ও মতবিনিময়ে আরও উপস্থিত ছিলেন শিল্পী রোকেয়া সুলতানা, আইভি জামান, রণজিৎ দাস, জাহিদ মুস্তাফা, গৌতম চক্রবর্তী, আনিসুজ্জামান, আনিসুজ্জামান সোহেল, ফারহানা ফেরদৌসী, ঢালী তমাল, কথাসাহিত্যিক ওয়াসি আহমেদ, আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুন, স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর, অপি করিম প্রমুখ।

.‘কোনো প্রতিষ্ঠানকে এভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়াটা জবরদস্তি সংস্কৃতির অংশ’