দলে সাতজন ফরোয়ার্ড থাকা সত্ত্বেও ভুটানের বিপক্ষে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ম্যাচে আক্রমণভাগের কেন্দ্রে দেখা গেল এক রক্ষণভাগের খেলোয়াড়কে। রাইটব্যাক বিশ্বনাথ ঘোষকে দলের 'নাম্বার নাইন' হিসেবে মাঠে নামালেন কোচ। গোল করার মূল দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের সরিয়ে একজন ডিফেন্ডারকে কেন গোলের খোঁজে পাঠানো হলো? বাংলাদেশের ফুটবলে কি সত্যিই স্ট্রাইকারের এত অভাব, নাকি বিদ্যমান খেলোয়াড়দের তৈরি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে? ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচের পর এই প্রশ্নগুলোই এখন সামনে এসেছে।
জাতীয় স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই সেন্টার ফরোয়ার্ডের ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করেন বিশ্বনাথ। এই পজিশনে তিনি খেলেছেন মোট ৬৫ মিনিট। তবে জাতীয় দলে তাঁর পরিচিতি একজন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে। ক্লাব ক্যারিয়ারেও তিনি সাতটি ভিন্ন পজিশনে খেলেছেন, তবে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর নেই।
কোচ টমাস ডুলির পরিকল্পনা ছিল, বিশ্বনাথের গতি, শারীরিক শক্তি এবং নিরন্তর দৌড় প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য অস্বস্তি তৈরি করবে। তবে গোল করার ক্ষেত্রে এই কৌশল খুব একটা কার্যকর হয়নি। ম্যাচে তিনবার গোল করার সুযোগ পেয়েছিলেন বিশ্বনাথ, তবে তিনবারই তিনি ব্যর্থ হন। ১৮ মিনিটে রাকিবের ক্রস থেকে দূরের পোস্টে হেড করলেও বল লক্ষ্যে রাখতে পারেননি তিনি। ২৫ মিনিটে প্রায় ফাঁকা গোল পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগাননি। এরপর ৩৯ মিনিটে সামনে শুধু ভুটানের গোলকিপারকে পাওয়া অবস্থায় নেওয়া তাঁর শটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এভাবে তিনটি বড় সুযোগ হাতছাড়া করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত বদলি হিসেবে মাঠে নামা মোহাম্মদ ইব্রাহিমের গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় বাংলাদেশ। সাফে শুরুটা জয় দিয়ে হলেও বিশ্বনাথকে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। কেন বিশ্বনাথকে বেছে নেওয়া হলো, সে বিষয়ে কোচ ডুলির ব্যাখ্যা, “আমাদের নাম্বার নাইন নেই। কাউকে না কাউকে তো তৈরি করতে হবে। আমার কাছে মনে হয়েছে বিশ্বনাথ সে জায়গায় ভালো করবে। তাঁর আক্রমণাত্মক মনোভাব, তীব্র চেষ্টা, বল পাওয়ার ক্ষুধা দলের জন্য ইতিবাচক।”
অর্থাৎ, একজন আদর্শ নম্বর নাইন খুঁজতে গিয়ে বিশ্বনাথকে দিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছেন কোচ। বিশ্বনাথ নিজেও অবগত যে, স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলা তাঁর স্বাভাবিক দায়িত্ব নয়। মুক্তকণ্ঠকে মুঠোফোনে তিনি বলেন, “আসলে এটা কোচের সিদ্ধান্ত। দলের প্রয়োজনে কোচ আমাকে যেখানে বলবে, সেখানেই তো খেলতে হবে। এটা ঠিক, আমার স্বাভাবিক পজিশন ডিফেন্ডারই। অন্য পজিশনে ভালোও করতে পারি, আবার খারাপও করতে পারি। সেটার নিশ্চয়তা দিতে পারব না।”
ক্লাব ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বনাথ রাইটব্যাক হিসেবে খেলেছেন ৬৩ ম্যাচ, সেন্টারব্যাকে ৩৪, লেফটব্যাকে ৯ এবং লেফট উইঙ্গারে ২ ম্যাচ। এছাড়া সেন্ট্রাল মিডফিল্ড, রাইট মিডফিল্ড ও রাইট উইঙ্গার হিসেবে তিনি একটি করে ম্যাচ খেলেছেন। কিন্তু সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে তাঁর অভিজ্ঞতা শূন্য।
অন্যদিকে, জাতীয় দলের জার্সিতে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে ১৮ ম্যাচ খেলেছেন রাকিব হোসেন, যেখানে তাঁর গোল ৫টি এবং অ্যাসিস্ট ২টি। এছাড়া মোহাম্মদ ইব্রাহিম, ফয়সাল আহমেদ ও ফাহামিদুল ইসলামেরও এই পজিশনে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে তাঁদের কাউকেই শুরু থেকে মাঠে নামানো হয়নি। যদিও কোচ ডুলির সিদ্ধান্তে রাকিব হোসেন কোনো প্রশ্ন তুলতে চাননি। তাঁর মতে, “কোচ কখন কাকে কোথায় খেলাবেন, সেটা তাঁর সিদ্ধান্ত। আমি সেন্টার ফরোয়ার্ডে খেলতেও প্রস্তুত।”
বিশ্ব ফুটবলে পজিশন পরিবর্তনের মাধ্যমে সফল হওয়ার উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন ওয়েলসের গ্যারেথ বেল ডিফেন্ডার থেকে নিজের সময়ের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড হয়ে উঠেছিলেন। তবে এটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ঘটনা। শুধু গতি বা শারীরিক শক্তি থাকলেই একজন ভালো স্ট্রাইকার হওয়া যায় না; এর জন্য প্রয়োজন গোল করার সহজাত দক্ষতা, সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছানো এবং সুযোগকে গোলে রূপান্তর করার ক্ষমতা।
জাতীয় দলের সাবেক কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক পজিশন বদলে খেলানোকে অস্বাভাবিক মনে করেন না। নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পজিশন বদলে খেলানো কোচদের জন্য নতুন কিছু নয়। আমি নিজেও রাইটব্যাক থেকে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছি। ব্রাদার্স ইউনিয়নে খেলার সময় ডিফেন্ডার টুটুল ভাইকেও পজিশন বদলে মাঠে নামান কোচ। আমি নিজেও এমন পরীক্ষা করেছি। কোচরা কার মধ্যে কী সম্ভাবনা আছে, সেটা মাঝেমধ্যে দেখতে চান।”
তবে ২০০৩ সালের সাফজয়ী দলের সদস্য ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাবেক কোচ আলফাজ আহমেদের প্রশ্নটি ভিন্ন। তাঁর মতে, পরীক্ষা করার প্রয়োজন হলে তা স্থানীয় ফরোয়ার্ডদের দিয়ে করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, “স্থানীয় ফরোয়ার্ড অনেকেই ছিলেন যাঁরা স্ট্রাইকার হিসেবেও খেলতে পারেন। তাদের নিয়ে পরীক্ষা চালানো যেত।”
সাবেক কোচ হাসানুজ্জামান বাবলুর মতে, এই সমস্যার মূল কারণ শুধু জাতীয় দলে নয়, বরং ঘরোয়া ফুটবলেও। দেশের লিগে ক্লাবগুলো স্ট্রাইকার পজিশনে বিদেশি খেলোয়াড়দের বেশি প্রাধান্য দেয়, যার ফলে স্থানীয় ফরোয়ার্ডরা পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ পান না এবং অনেক সময় বেঞ্চেই বসে থাকেন। বাবলুর প্রশ্ন, “নিয়মিত স্ট্রাইকার পজিশনে স্থানীয়রা খেলার সুযোগ না পেলে গোল করার অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে কীভাবে?”
এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গোল করার অভ্যাস একদিনে তৈরি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত ম্যাচ খেলা, গোলের সুযোগ পাওয়া এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় চেষ্টা করা। স্থানীয় ফরোয়ার্ডদের জন্য এই সুযোগ না থাকলে জাতীয় দলের জন্য নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার তৈরি হওয়া অসম্ভব। ক্লাব ফুটবলে স্থানীয়দের সুযোগ না পাওয়া, পজিশনভিত্তিক দক্ষতার অভাব এবং জাতীয় দলে বিকল্পের সংকট মিলিয়েই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সাতজন ফরোয়ার্ডের দলে একজন ডিফেন্ডারকে নম্বর নাইন বানানোর সিদ্ধান্ত কেবল একজন কোচের পরীক্ষা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ফুটবলে স্ট্রাইকার তৈরির দীর্ঘদিনের ব্যর্থতারই এক প্রতিচ্ছবি। ফরোয়ার্ডের অভাব যতটা, তার চেয়ে বড় অভাব হয়তো তাদের তৈরি করার প্রক্রিয়ার।