জয়ের লক্ষ্যে একটি গোলের জন্য ব্যাকুল ছিল বাংলাদেশ। একের পর এক আক্রমণ গড়ে তুললেও ভুটানের রক্ষণভাগ ভাঙতে হিমশিম খাচ্ছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে আক্রমণভাগে কৌশলগত পরিবর্তন আনেন কোচ টমাস ডুলি। তিনি মাঠে নামান মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে। কোচের মূল পরিকল্পনা ছিল ইব্রাহিমের মাধ্যমে বল ধরে রাখা এবং সতীর্থদের জন্য গোলের সুযোগ তৈরি করা। তবে কোচের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গিয়ে নিজেই গোল করে বসলেন এই ফরোয়ার্ড। তার এই একক নৈপুণ্যের গোলেই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ম্যাচে জয় দিয়ে শুভ সূচনা করল বাংলাদেশ। ম্যাচ শেষে কোচ ডুলি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ইব্রাহিম নিজেই গোল করবেন এমনটা তিনি ভাবেননি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভুটানকে ১-০ গোলে পরাজিত করে বাংলাদেশ। ম্যাচের ৬৯তম মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামা ইব্রাহিম করেন জয়সূচক গোলটি। দীর্ঘক্ষণ ধরে গোলের জন্য অপেক্ষা করা বাংলাদেশকে স্বস্তি দেওয়া এই গোলের পেছনের পরিকল্পনা ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান ডুলি।
বাংলাদেশ কোচ জানান, বিশ্বনাথ ঘোষকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল তার ক্লান্তি এবং আক্রমণভাগে বল ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা। এদিন নিয়মিত ডিফেন্ডার বিশ্বনাথকে মূল স্ট্রাইকার হিসেবে মাঠে নামিয়েছিলেন তিনি। তবে বেশ কিছু সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও গোল করতে ব্যর্থ হন এই ফুটবলার। পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ দৌড়ানোর ফলে দ্বিতীয়ার্ধে তিনি কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
ডুলি বলেন, ‘বিশ্বনাথ অনেক দৌড়ানোর কারণে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সে এমন খেলোয়াড় নয়, যে বল ধরে রাখতে পারে। আমাদের এমন একজনকে দরকার ছিল, যে বল ধরে রেখে শমিত, রাকিব ও ফাহিমকে আক্রমণে উঠে আসার সময় দিতে পারবে।’
এই চিন্তা থেকেই ইব্রাহিমকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন কোচ। তাকে ১০ নম্বর পজিশনে বসিয়ে শমিত সোমকে আরও সামনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে আক্রমণ সাজানোর জন্য শমিতকে বারবার মাঝমাঠে নেমে আসতে হচ্ছিল, যার ফলে প্রতিপক্ষের গোলমুখে সঠিক সময়ে উপস্থিত হতে পারছিলেন না তিনি।
ডুলির পরিকল্পনা ছিল, ইব্রাহিম বল ধরে রেখে আক্রমণ গড়ে তুলবেন এবং শমিত সামনে থেকে গোল করার সুযোগ খুঁজবেন। এতে শমিতের শক্তি সাশ্রয় হবে এবং প্রতিপক্ষের বক্সে তার উপস্থিতি বাড়বে। তবে পরিকল্পনার সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ ছিল ইব্রাহিমের গোল। ডুলির ভাষায়, ‘আমি ভাবিনি ইব্রাহিম নিজেই গোল করে বসবে, ভেবেছিলাম সে হয়তো কাউকে দিয়ে গোল করাবে। তবে ভালো ফুটবলাররা এমন মুহূর্ত তৈরি করতে পারে।’
কোচের প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে যান ইব্রাহিম। মাঠে নামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভুটানের রক্ষণ ভেঙে গোল করেন তিনি। জায়ান আহমেদের ক্রস থেকে শমিত সোমের হেডের পর বলটি প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে ইব্রাহিমের সামনে চলে আসে। ফরটিস এফসির এই ফরোয়ার্ড সুযোগটি হাতছাড়া করেননি। দুর্দান্ত এক ভলিতে বল জালে পাঠিয়ে বাংলাদেশকে লিড এনে দেন তিনি।
ইব্রাহিমের গোলের পাশাপাশি বিশ্বনাথকে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও কথা বলেন ডুলি। তার মতে, বিশ্বনাথের শারীরিক সক্ষমতা, পরিশ্রম করার ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার গুণাবলী আক্রমণভাগে কার্যকর হতে পারে। তাই প্রচলিত পজিশনের বাইরে তাকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
ডুলি জানান, ডান প্রান্তে সাদ উদ্দিন ও তারিক কাজীর ভালো খেলার কারণে বিশ্বনাথকে ভিন্নভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ খুঁজছিলেন তিনি। অন্যদিকে তার আক্রমণাত্মক খেলার ধরন রক্ষণভাগে কিছুটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে খেললে পেনাল্টি কিংবা লাল কার্ড পাওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে মনে করেন কোচ। তবে আক্রমণভাগে বিশ্বনাথের নিরন্তর দৌড় এবং শারীরিক লড়াইয়ে পিছিয়ে না থাকার মানসিকতা ডুলিকে মুগ্ধ করেছে।
গোল করতে না পারলেও বিশ্বনাথের পারফরম্যান্সে সন্তোষ প্রকাশ করেন ডুলি। তিনি বলেন, ‘সামনের দিকে বিশ্বনাথ যে শক্তি নিয়ে খেলে, সেটি ডিফেন্ডারদের জন্য কঠিন। সে থামে না, পুরো শক্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যায়। আমি চেয়েছিলাম সে গোল করার সুযোগ পাক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গোল করতে পারেনি, তবে তার পারফরম্যান্সে আমি খুশি।’
এদিকে ইব্রাহিমের জন্য এই গোলটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গত সেপ্টেম্বরে ফিফা আসিয়ান কাপের চূড়ান্ত দল থেকে বাদ পড়েছিলেন তিনি। তবে পরবর্তীতে ক্লাব ফুটবলে নিজেকে প্রমাণ করেন। কিরগিজস্তানের মুরাস ইউনাইটেডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে ফরটিস এফসিকে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের গ্রুপ পর্বে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন এই ফরোয়ার্ড।
ইব্রাহিমকে আগে দলে না রাখার কারণ ব্যাখ্যা করে ডুলি জানান, বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর সব খেলোয়াড়ের সামর্থ্য বোঝার জন্য তিনি পর্যাপ্ত সময় পাননি। তবে এবারের অনুশীলনে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করায় ইব্রাহিমকে দলে রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
ডুলি জানান, নতুন একটি দেশে কোচিং করতে এসে সব খেলোয়াড়কে ভালোভাবে চেনা সহজ নয়। কার কী ধরনের সামর্থ্য রয়েছে, তা বুঝতে সময় লাগে। অনেক সময় অনুশীলনেও কোনো ফুটবলারের প্রকৃত সামর্থ্য চোখে পড়ে না। তবে এবার ইব্রাহিমের অনুশীলনের পারফরম্যান্স তাকে মুগ্ধ করেছে।
জাতীয় দলে ফিরে প্রথম ম্যাচেই জয়সূচক গোল করে সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন ইব্রাহিম। তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের মাঝেও দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন তিনি। তার মতে, ভুটানের বিপক্ষে আরও উন্নত ফুটবল খেলা এবং বড় ব্যবধানে জয় পাওয়া উচিত ছিল বাংলাদেশের।