চিত্রনায়িকা পরীমনিকে স্পর্শ করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন দৈনিক সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইন। উল্টো তিনি অভিযোগ করেছেন যে, পরীমনি তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নিয়েছিলেন।
রবিউল হোসাইন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পরীমনি তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন। সবকিছুই ভিডিওতে দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে চিত্রনায়িকা পরীমনি সাংবাদিক রবিউল হোসাইনের বিরুদ্ধে তাঁকে স্পর্শ করার অভিযোগ আনেন। পরবর্তীতে সাংবাদিকদের সামনেই রবিউলকে গালিগালাজ করতে দেখা যায় পরীমনিকে।
ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের দায়ের করা একটি মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়েছিলেন পরীমনি।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ৬ জুলাই ঢাকার আদালতে মামলাটি দায়ের করেন নাসির উদ্দিন মাহমুদ। ওই মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, ২০২১ সালের ৯ জুন রাতে পরীমনি ও তাঁর সহযোগীরা সাভারের বোট ক্লাবে ভাঙচুর করেন এবং মারধর ও হত্যার হুমকি দেন। তবে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নাসির উদ্দিনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আগেই সাভার থানায় মামলা করেছিলেন পরীমনি। বর্তমানে ওই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া চলছে এবং নাসির উদ্দিন জামিনে রয়েছেন।
নাসির উদ্দিনের মামলায় পরীমনির আদালতে আসার খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সেখানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত হন। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে পরীমনি গাড়ি থেকে নেমে এজলাসের দিকে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে চাইলে তাঁর নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়।
ঠিক এই সময়েই সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইনের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে পরীমনির বিরুদ্ধে। রবিউল দাবি করেন, পরীমনিই তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নিয়েছিলেন। এছাড়া ভিডিও ধারণের কাজে ব্যবহৃত তাঁর ট্রাইপডটি পরীমনির সঙ্গে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা ভেঙে ফেলেন। পরে তিনি পরীমনির হাত থেকে ফোনটি উদ্ধার করেন।
লিফটে ওঠার সময় ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন পরীমনি। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যখন লিফটে উঠছি, একজন আমারে উঠতে দেবে না। কোর্টের একটা টাইম আছে, সময়মতো আমাকে পৌঁছাতে হবে তো। মোবাইলটা আমার মাথার পাশ দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে, একটা স্ট্যান্ডও ছিল। মোবাইলের জন্য লিফট কোনোভাবে বন্ধ হচ্ছিল না। আমি হাত দিয়ে মোবাইল সরিয়ে দিয়েছি। সরানোর পর মনে হলো, কেউ একজন আমার হাতটা ধরেছে।’
পরীমনি আরও বলেন, ‘যে দুজন আমাকে ধরছে, তাদের স্পর্শ তো আমি জানি। এ রকম ব্যথা দেওয়া টাইপ ধরা, খামচি মারা কী রকম করে ধরা যেন, আমি ব্যথা পাইছি। এ–ও মনে হয়েছিল, রাতুল (সঙ্গে থাকা একজন) আমাকে এভাবে ধরল কেন? তাকায়ে দেখি, ওই ছেলে (সাংবাদিক রবিউল হোসাইন)।’
পরবর্তী সময়ে পরীমনি বলেন, ‘আমি চেহারাটা মনে রাখছি। জামিনের পর পুরো আদালতে যতক্ষণ হাঁটছি, ওরে আমি খুঁজছি। কাঠগড়ায় জামিন নিয়ে এসে নিচে নেমে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি তারে, এরপর বললাম, এদিকে আয়। তুই তোকারি করে ডাক দিয়েছি। আমার হাত এভাবে ধরলি কেন জিজ্ঞেস করতেই তখন দেখি সে বলছে, “আপা আমার ট্রাইপড ভেঙে দিয়েছে”। তখন আমার মনে হয়েছে, মাটির মধ্যে পুঁতে ফেলি। হাত উঠতে উঠতেও কেন জানি ওঠেনি।’
পরীমনির এই অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ করে রবিউল হোসাইন জানান, তিনি লিফটে ওঠেননি। বরং লিফটের এক কোণায় দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করছিলেন তিনি। তাঁর মুঠোফোন বা ট্রাইপডের কারণে লিফট বন্ধ হচ্ছিল না—এই দাবিটি সম্পূর্ণ অসত্য।
রবিউল আরও বলেন, ‘এখন আগে থেকে লিফটে থাকা কোনো ক্যামেরা পারসন কিংবা আইনজীবী, তাঁদের কারও কারণে লিফট বন্ধ হচ্ছিল না কি না, এটা আমার জানা নেই। পরীমনি লিফটে ঢোকার পথে আমার ফোনটা টান দিয়ে নিয়ে নেন। লিফটে ওঠার সময় আমি উনার পথ আটকাব কেন, উনার চলার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা আমি কখনো তৈরি করিনি।’
পরীমনিকে স্পর্শ করার অভিযোগের জবাবে রবিউল বলেন, ‘উনি বলছেন স্পর্শ করার কথা, কিন্তু আমার বাঁ হাতে মোবাইল ও ট্রাইপড ছিল। আমার ডান হাত পুরোপুরি রিজার্ভ (রবিউল হোসাইনের ডান হাত জন্মগতভাবে বাঁ হাতের তুলনায় ছোট, হাতের তিনটি আঙুল নেই, এই হাত দিয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম তিনি করতে পারেন না), এই হাত দিয়ে তো স্পর্শ করার কোনো ধরনের সুযোগ নাই—এটা আমাকে সামনাসামনি যাঁরা দেখেছেন, তাঁরাই জানেন।’
তিনি আরও জানান, ‘কে বা কারা তাঁকে (পরীমনি) স্পর্শ করেছে, এটা আমি বলতে পারছি না। ওই লিফটে উনার সঙ্গে তাঁরই নিরাপত্তারক্ষীরা ছিল।’
আদালত থেকে বের হওয়ার সময়ও উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি। শুনানি শেষে ৫০০ টাকা মুচলেকায় জামিন পান পরীমনি। তবে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার সময় পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, পরীমনির নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁদের ধাক্কাধাক্কি করেন। একপর্যায়ে পরীমনি নিজেই সাংবাদিক রবিউল হোসাইনের দিকে এগিয়ে যান এবং তাঁকে ডেকে গালিগালাজ করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পরীমনির সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরাও সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়ান।
আদালত থেকে বের হওয়ার সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করে রবিউল মুক্তকণ্ঠকে জানান, পরীমনির সঙ্গে থাকা একজন (খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাঁর নাম তুরান মুনশি) প্রথমে তাঁর কাছে লিফটে গায়ে হাত দেওয়ার বিষয়ে জানতে চান। এরপর পরীমনি নিজেই তাঁর দিকে এগিয়ে আসেন।
রবিউল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘তিনি (পরীমনি) আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করছিলেন। যাওয়ার সময় আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে যান। আমার সঙ্গে আসলে তখন কী কী করা হয়েছে, তা ভিডিওতে সব আছে, সবাই তা দেখেছেন।’
ওই দিনের ধাক্কাধাক্কির ঘটনায় শুধু সাংবাদিকরাই নন, একজন বিচারপ্রার্থীও আহত হয়েছেন। সুজন চন্দ্র মণি দাস নামের ওই ব্যক্তির মাথা ফেটে রক্ত বের হয়। তাঁর ভাইয়ের অভিযোগ, পরীমনির নিরাপত্তারক্ষীদের ধাক্কায় তিনি আহত হয়েছেন।
এছাড়া জাগো নিউজের প্রতিবেদক আশিকুজ্জামান ও মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আব্দুল্লাহ আল কাউছার, আগামীর সময়ের প্রতিবেদক সিয়াম হোসেন এবং টাইমস টুডের শাহ রিয়াজ আহত হয়েছেন। আহত সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ কেউ হাসপাতালে চিকিৎসাও নিয়েছেন।
এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ডিজিটাল রিপোর্টার্স ফোরাম। গতকাল বৃহস্পতিবার পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে চিত্রনায়িকা পরীমনির বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তী সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধেও সাংবাদিক ও সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলা, ধাক্কাধাক্কি ও মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত পাঁচ সাংবাদিক আহত ও লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ডিজিটাল রিপোর্টার্স ফোরাম (ডিআরএফ)।
সংগঠনটি আরও লিখেছে, একজন অভিনেত্রী হিসেবে পরীমনি আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া, তাঁদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ কিংবা নিরাপত্তাকর্মীদের মাধ্যমে হেনস্তার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের আহত হওয়ার ঘটনাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ডিআরএফ মনে করে, সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ শুধু তাঁদের পেশাগত মর্যাদার ওপর আঘাত নয়, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব পালনের পরিবেশের জন্যও হুমকিস্বরূপ। অবিলম্বে পরীমনি ও তাঁর নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।