ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় চিত্রনায়িকা পরীমনির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। আজ বুধবার ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রাহমানের আদালত এই আদেশ প্রদান করেন।

আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আলোচিত এই অভিনেত্রী জানান, তিনি বর্তমানে চরম মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “কাজের জায়গায়, সংসারজীবনে, সবকিছুর ওপরেই তো একটা চাপ। এসব তো হেনস্তা।” তাঁর অভিযোগ, এই মামলাটিকে কেন্দ্র করে তাঁকে প্রচণ্ড হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার তিনি আদালতে হাজির হবেন বলে জানিয়েছেন পরীমনি।

মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে এই অভিনেত্রী তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের ওপর বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “এই জীবনে যা হচ্ছে, এসব তো খুব একটা আরামের না। এখন যা হচ্ছে, তা হেনস্তাই। মামলা নিয়ে আমাকে প্রচণ্ড হেনস্তা করা হচ্ছে।”

মামলাটির তদন্ত প্রক্রিয়ার বিষয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। পরীমনির দাবি, তদন্তটি যথাযথভাবে করা হচ্ছে না এবং এটি সঠিকভাবে হওয়া প্রয়োজন। কথা প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন করেন, “এটা কি তাহলে সারা জীবন চলবে?” গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “কালকে যাব আদালতে, যেহেতু পরোয়ানা জারি করে ফেলেছে। কিছুই তো করার নেই।”

অন্যদিকে, পরীমনির আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত (সুরভী) মুক্তকণ্ঠকে জানান, অ্যালার্জিজনিত শারীরিক সমস্যার কারণে আজ পরীমনি আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি। এই কারণে সময় চেয়ে আবেদন করা হলেও আদালত তা নামঞ্জুর করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণের দিন নির্ধারিত ছিল। শুনানির সময় বাদী আদালতে উপস্থিত হয়ে আসামিদের জামিন বাতিলের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত পরীমনির জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালের ৬ জুলাই, যখন নাসির উদ্দিন ঢাকার আদালতে এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয় যে, পরীমনি ও তাঁর সহযোগীরা অ্যালকোহলসেবী এবং তাঁরা বিভিন্ন নামী ক্লাবে ঢুকে বিনামূল্যে অ্যালকোহল পান ও পার্সেল নিয়ে যান এবং মূল্য পরিশোধ করেন না। আরও অভিযোগ করা হয়, পরীমনি তাঁর পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রভাব খাটিয়ে মিথ্যা মামলা করে হয়রানির ভয় দেখান।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৯ জুন রাত ১২টার পর আসামিরা সাভারের বোট ক্লাবে প্রবেশ করে দ্বিতীয় তলার ওয়াশরুম ব্যবহার করেন এবং এরপর ক্লাবের ভেতরে বসে অ্যালকোহল পান করেন। রাত সোয়া একটার দিকে বাদী নাসির উদ্দিন ও তাঁর সহযোগী শাহ শহিদুল আলম যখন ক্লাব ত্যাগ করছিলেন, তখন পরীমনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে নাসির উদ্দিনকে ডেকে তাঁদের সঙ্গে বসার অনুরোধ করেন। অভিযোগ করা হয়েছে, একপর্যায়ে পরীমনি অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নাসির উদ্দিনকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন এবং একটি ব্লু লেবেল অ্যালকোহলের বোতল বিনামূল্যে পার্সেল দেওয়ার জন্য চাপ দেন। বাদী এতে রাজি না হলে পরীমনি তাঁকে গালমন্দ করতে শুরু করেন। বাদানুবাদের এক পর্যায়ে পরীমনি বাদীর দিকে একটি সার্ভিং গ্লাস এবং তাঁর মুঠোফোন ছুড়ে মারেন, যার ফলে নাসির উদ্দিনের মাথা ও বুকে আঘাত লাগে। এছাড়া পরীমনি ও তাঁর সহযোগীরা নাসির উদ্দিনকে মারধর ও হত্যার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি ভাঙচুর করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার পরিদর্শক মো. মনির হোসেন ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদনে পরীমনি ও তাঁর কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমি ওরফে জিমের বিরুদ্ধে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে মামলার অন্য আসামি ফাতেমা তুজ জান্নাত বনির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

গত বছরের ২৬ জানুয়ারি আদালত এই দুই আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। উল্লেখ্য, একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরীমনি সাভার থানায় বাদীসহ দুজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একটি পাল্টা মামলা করেন। বর্তমানে ওই মামলাটি ঢাকার ৯ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।