মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিতে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে পদত্যাগের কথা ভাবছেন বলে জানা গেছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকটি সূত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে, রুবিও সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করতে ইরান যুদ্ধসহ প্রশাসনের নানা নীতি থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাচ্ছেন।
আটলান্টিকের দুই পাড়েই মার্কো রুবিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে জল্পনা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে নামতেই তিনি পদত্যাগ করবেন।
সূত্রগুলো বলছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথা হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ২০২৮ সালের নভেম্বরে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী হওয়ার দৌড়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বর্তমানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সই তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের হতাশাজনক ফলাফলের আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকারের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে নিজের জ্যেষ্ঠ পদটি ছেড়ে দিতে পারেন রুবিও।
মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে এক কঠোর বার্তা দেওয়ার পর রুবিও বিষয়টি আরও সক্রিয়ভাবে ভাবছেন বলে সূত্রগুলো বলছে। এই নির্বাচনে কানসাস ও টেক্সাসের মতো রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো ডেমোক্র্যাটদের কাছে হারিয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই হতাশাজনক ফলের পর ট্রাম্পের বর্তমান মন্ত্রিসভার চার-পাঁচজন সদস্য পদত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মার্কো রুবিও।
ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছেন, ‘ইরান যুদ্ধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা এবং সেটির দায় ট্রাম্পের ওপর চাপানো’ রুবিওর জন্য এখন খুবই দরকার।
রুবিওর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেছেন, তাঁর পদত্যাগ করা এবং প্রশাসন ছেড়ে দেওয়া পুরোপুরি যৌক্তিক।
বর্তমানে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন। তিনি নিশ্চিতভাবেই ভ্যান্সের চেয়ে এগিয়ে আছেন।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় রুবিও নির্বাচনে লড়তে পারবেন না। তা ছাড়া এই প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত থাকাটা এখন তাঁর জন্য সম্ভাব্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের চরম বাজে ফলের পরপরই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামনে আসেন। নিজের দায় এড়াতে তিনি হারের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেন। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প এই নীতি ও মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের দায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর চাপাতে পারেন। পাশাপাশি রুবিও এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি উইলসও বলির পাঁঠা হতে পারেন।
ভ্যান্স কড়া এক মন্তব্যে বলেছেন, ‘আমাদের হেরে যাওয়ার আসল কারণ প্রায় সবার কাছেই স্পষ্ট...আমাদের হেরে যাওয়ার কারণ হচ্ছে এই যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট নিজে গতকাল রাতে এ কথা বলেছেন।’
ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা এখান থেকে কোন দিকে যাব, তা নিয়ে যেকোনো সৎ আলোচনা এখন থেকেই শুরু করতে হবে।’
যুক্তরাজ্য সরকার ও রিপাবলিকানদের একাংশ বলছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রধান হওয়া সত্ত্বেও রুবিও ইতিমধ্যে ইরান ইস্যুতে বেশ ‘নীরব ভূমিকা’ পালন করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত তিনজন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁরা হলেন—ডেভিড ল্যামি, ইভেট কুপার এবং বর্তমান এড মিলিব্যান্ড। সবার ওপরই তিনি ভালো প্রভাব ফেলেছেন।
যুক্তরাজ্য সরকারের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারের পর তিনি কী করেন, তা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। তিনি যে পদে বহাল থাকবেন, তা অসম্ভব মনে হচ্ছে। তিনি শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবেন এবং আমরা আশা করছি, তিনি নির্বাচনে লড়াই করবেন।’
অন্য এক রিপাবলিকান সূত্র বলেছে, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই হারের পর রুবিও আর থাকছেন না। তাঁদের মধ্যে প্রায় চার বা পাঁচজন ইস্তফা দিয়ে সরে পড়বেন।’
সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ পুরোপুরি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলে গেছে। মানচিত্রে ইরান কোথায়, মার্কিনরা তাও বলতে পারে না। আর তারা এই যুদ্ধটাও বোঝে না। জ্বালানি তেলের দাম মানুষকে সত্যিই খুব খেপিয়ে তুলেছে।
সূত্রগুলো বলছে, ‘ডেমোক্র্যাটরা একবার হাউস ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিলে আমরা শুধুই অভিশংসনের উদ্যোগই দেখতে পাব। এ অবস্থায় আর কেউ–ই সরকারে থাকতে চান না।’
ফ্লোরিডার এক নিরাপদ সিনেট আসন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে রুবিওর উত্থান তাঁকে ট্রাম্পের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। অথচ এক দশক আগে নিজের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর তুমুল বিবাদ হয়েছিল।
যাঁকে একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘লিটল মার্কো’ বলে উপহাস করেছিলেন, সেই ব্যক্তি এখন ট্রাম্পের ভেতরের সার্কেলে শক্ত অবস্থান করে নিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ব্যবস্থার ওপর এমন এক পর্যায়ের কর্তৃত্ব উপভোগ করছেন, যা কেবল প্রয়াত হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গেই তুলনা করা চলে। কিসিঞ্জার একাধারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকে রুবিও অন্যান্য দায়িত্বও নিতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত আর্কাইভিস্ট এবং ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের (ইউএসএআইডি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিন মাস পর ট্রাম্প তাঁকে তাঁর ভারপ্রাপ্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রুবিও পররাষ্ট্রনীতির এমন অনেক বিষয় থেকে দূরে পড়ে গেছেন, যা সাধারণত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আওতায় পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে প্রশাসনের উদ্যোগ, এই উভয় দুটি বিষয়েই রুবিওকে মূলত ট্রাম্পের অনভিজ্ঞ প্রতিনিধিদের সুবিধার্থে সরিয়ে রাখা হয়েছে। তাঁরা হলেন আবাসন ব্যবসায়ী থেকে ‘শান্তি মিশনের বিশেষ প্রতিনিধি’ হওয়া স্টিভেন উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের মেয়েজামাই জ্যারেড কুশনার।
এসব সত্ত্বেও প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে রুবিওর গুরুত্ব তাঁকে ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। এখন ২০২৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সিদ্ধান্ত নিলে তিনি হয়তো সেই সুবিধা পাবেন।
তবে দ্বিতীয় কোনো প্রচার শুরু করলে লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত নীতিগুলোতে তাঁর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদকবাহী বলে সন্দেহ করা ছোট নৌকাগুলোতে বিমান হামলা, যাকে সমালোচকেরা বিচারবহির্ভূত হত্যা বলে অভিহিত করেছেন।
জানুয়ারিতে সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। হোয়াইট হাউস ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠ এবং অস্পষ্ট সম্পর্ক তৈরি করেছে, তা তদারকিতেও রুবিও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
রুবিও তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে চলা জল্পনা-কল্পনাকে হালকা করার চেষ্টা করেছেন। সেপ্টেম্বরে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার ব্যাপারে তার ‘এই মুহূর্তে কোনো পরিকল্পনা নেই’। কারণ, তিনি প্রশাসনে তাঁর দায়িত্বের ওপর ‘১০০ ভাগ মনোযোগী’। তিনি এটাও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভ্যান্স নির্বাচনে লড়লে তিনি সরে দাঁড়াবেন।
রুবিওর অঙ্গরাজ্যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছেন, রুবিও প্রশাসন ছেড়ে দিলে তিনি অবাক হবেন না। তবে তিনি মনে করেন, কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের পতন তদারকি করার সুযোগ থাকলে তিনি হয়তো পদত্যাগ পিছিয়ে দিতে পারেন।
প্রশাসনের ভেতরের এক ব্যক্তি দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, রুবিও পদ ছাড়তে চান এমন কোনো লক্ষণ দেখাননি। অবশ্য ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হোয়াইট হাউসের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বিষয়টির পরিবর্তন হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্র জানায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের হতাশাজনক ফলাফল রুবিওকে পদে বহাল থাকতে উৎসাহিত করতে পারে। যাতে স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়া যায় এবং ট্রাম্প রেগে গেলে প্রশাসনের ভেতরে এক মধ্যপন্থী কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করা যায়।
ট্রাম্পের শীর্ষ কূটনীতিক পদত্যাগের পরিকল্পনা করছেন কি না, এমন তথ্যের ইঙ্গিত ট্রাম্পের কাছে আছে কি না জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস অ্যাঙ্গেল বেশ অশালীন ভাষায় কথা বলেন। তিনি ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনকে নিয়ে ভিত্তিহীন, মিথ্যা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানোর অভিযোগে’ দ্য ইনডিপেনডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।
অ্যাঙ্গেল আরও যোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ঐক্যবদ্ধ একটি দল গঠন করেছেন, যারা তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি নিয়ে কাজ করছে।