যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর নিজ দলের অভ্যন্তরেই নীতি ও কৌশল পরিবর্তনের প্রবল চাপের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকান মিত্র এবং রাজনৈতিক কৌশলবিদেরা হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের রদবদল করার পাশাপাশি প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং শুল্কনীতির মতো বিষয়গুলোকে নির্বাচনের এই হারের প্রধান কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, তাই এসব বিতর্কিত অবস্থান থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
তবে গত মঙ্গলবারের ভোটে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েও কৌশল বদলানোর তেমন কোনো ইঙ্গিত দেননি ট্রাম্প। নির্বাচনের রাতের এক সাক্ষাৎকারে ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘এটাকে আমার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছি না।’
কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে ডেমোক্র্যাটরা এখন ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের প্রস্তাবগুলো আটকে দিতে পারবেন। পাশাপাশি তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা এবং তাঁর মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার ক্ষমতা পাবেন তাঁরা। এই পরিস্থিতির কারণে নিজের কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করতে নির্বাহী ক্ষমতার ওপর ট্রাম্পের নির্ভরতা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
এমন অবস্থায় ট্রাম্প যদি তাঁর বর্তমান নীতিগুলো আঁকড়ে ধরে থাকেন, তবে তা রিপাবলিকানদের জন্য কতটা রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে, সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী দলীয় সদস্যদের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেডি ভ্যান্সের দূরত্ব
ট্রাম্পের সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গতকাল বুধবার নির্বাচনে হারের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। তাঁর এই মন্তব্যের ফলে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর কিছুটা দূরত্বের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
কৌশলবিদ ও দলীয় কর্মকর্তাদের মতে, রিপাবলিকান রাজনীতিবিদেরা যদি মনে করেন যে ভোটারদের ওপর ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ছে, তবে ভ্যান্সের মতো আরও অনেকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করবেন।
প্রবীণ রিপাবলিকান কৌশলবিদ জন ফিহেরি মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফলকে ট্রাম্পের জন্য ‘বিরাট বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের ব্যাপক রদবদল এখন সময়ের দাবি। তিনি মনে করেন, সময় যত গড়াবে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব ততটাই হ্রাস পাবে।
সতর্কবার্তা শোনেননি ট্রাম্প
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কর্মীদের বিদায়, মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য পরিবর্তন এবং ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের মুখে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সহযোগীরা। তাঁদের মনোবল বর্তমানে একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, নির্বাচনের ছয় সপ্তাহ আগেই ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ জরিপে দুই কক্ষেই হারের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। রাজনৈতিক পরিণতির সেই সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ইরান নিয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেননি ট্রাম্প। কারও কথা তিনি শুনতে রাজি হননি।
মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, আট মাসের ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকান প্রার্থীদের ক্ষতি করেছে। তবে যুদ্ধের পক্ষে নিজের অবস্থান তিনি আগের মতোই বজায় রেখেছেন।
বলরুম নিয়েও ক্ষোভ
নির্বাচনে হারের পেছনে শুধু যুদ্ধই একমাত্র কারণ ছিল না। মিশিগান ও আইওয়া অঙ্গরাজ্যের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট আসনে ভোটারদের সঙ্গে আলোচনায় আরেকটি অসন্তোষের বিষয়টি সামনে এসেছে। হোয়াইট হাউসের বলরুম এবং রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে সরকারি ভবন ও স্থাপনার সংস্কারকাজে ট্রাম্পের উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন অনেক রিপাবলিকান ও স্বতন্ত্র ভোটার।
একজন রিপাবলিকান রাজনৈতিক উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেছেন, আগামী দুই বছরও ট্রাম্প যদি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে থাকেন, তবে পরবর্তী নির্বাচনে দল আবারও বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। অথচ গতকালও সাংবাদিকদের বলরুমের নির্মাণস্থলে নিয়ে যান ট্রাম্প। এই প্রকল্পটিতে সময় দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, কাজটি তাঁকে স্বস্তি দেয়।