যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির শোচনীয় পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদলের গুঞ্জন ছড়িয়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁদের পদ ছাড়তে পারেন বলে বিভিন্ন আলোচনা শুরু হলে তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে হোয়াইট হাউস।
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এই বড় ধরনের পরাজয়ের পেছনে এই যুদ্ধকে অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে। ফলে অনেক মহলে তাঁকে দ্রুত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে।
এমনকি একজন বিদায়ী রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য আগামী সপ্তাহের শুরুতেই হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাবের ওপর ভোট আয়োজনের হুমকি দিয়েছেন। এই হুমকির প্রেক্ষিতে একটি ভিডিও বিবৃতিতে নিজের অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন হেগসেথ এবং অভিশংসনের এই উদ্যোগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।
হেগসেথ বলেন, ‘দেখুন, তারা আমাকে আক্রমণ করছে। তারা আমাদের আক্রমণ করছে, কারণ আমরা কার্যকর। এতে কোনো কাজ হবে না। আমরা পিছু হটব না।’
অন্যদিকে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পদত্যাগ করতে পারেন—এমন গুঞ্জনও সামনে এসেছে। তবে রুবিও নিজেই এই খবরের সত্যতা অস্বীকার করেছেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা তাঁর সব সময় ছিল।
রুবিও বলেন, ‘আমি যে কাজ করছি, তা ভালোবাসি। আর তাঁরা যখন বলেন, তিনি চাকরি ছেড়ে চলে যাবেন, তখন আমি সব সময় হাসি। আমি বলি, “কোন চাকরিটা?”’
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর রুবিওর পদত্যাগের যে খবর ছড়িয়েছিল, তা হোয়াইট হাউস এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর উভয়ই অস্বীকার করেছে। উভয় পক্ষই এই দাবিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে অভিহিত করেছে।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তুলনায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স—উভয়েই স্বীকার করেছেন যে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবের কারণে নির্বাচনে রিপাবলিকানরা পরাজিত হয়েছে। এই পরাজয়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে গেছে।
এবিসি নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, হেগসেথকে নিয়ে তিনি ‘কিছু ফোন পেয়েছেন’। তবে তা সত্ত্বেও তাঁকে দায়িত্বে রাখার ‘পূর্ণ ইচ্ছা’ তাঁর রয়েছে। পরবর্তীতে গতকাল বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘পিট হেগসেথ অসাধারণ কাজ করেছেন।’
এই সময় ট্রাম্প হেগসেথের কিছু সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন, যার মধ্যে জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে গ্রেপ্তার এবং ইরান যুদ্ধের বিষয়টি ছিল প্রধান। উল্লেখ্য, ইরান যুদ্ধটি এখন নবম মাসে পদার্পণ করেছে।
তবে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন অথবা সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারেন। আট মাস আগে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দুই সামরিক কর্মকর্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এদিকে ট্রাম্পের নিয়মিত সমালোচক হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকান প্রতিনিধি টমাস ম্যাসি হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। পলিটিকোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আগামী সপ্তাহের শুরুতেই তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অভিশংসনের প্রস্তাব উত্থাপন করবেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ম্যাসি লিখেছেন যে, জানুয়ারিতে নতুন ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ট্রাম্পের উচিত হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়া। ম্যাসি আরও লিখেছেন, ‘সিনেটে উত্তরসূরিদের নিয়োগ নিশ্চিত করার সুযোগ থাকা অবস্থাতেই তাঁর (ট্রাম্পের) এটি করা উচিত।’
এর পাশাপাশি গুঞ্জন রয়েছে যে, টেনেসি অঙ্গরাজ্যের একটি শূন্য সিনেট আসনে নির্বাচন করার আগ্রহ রয়েছে হেগসেথের।
নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিশংসনের উদ্যোগকে ‘ভুয়া অভিশংসন প্রস্তাব’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন হেগসেথ। ভিডিও বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, এই উদ্যোগের পেছনে ‘একজন অসন্তুষ্ট, পরাজিত কংগ্রেস সদস্য এবং তাঁর সব ডেমোক্র্যাট মিত্র’ কাজ করছেন। একই সঙ্গে তিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেন যে, কীভাবে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা বিভাগ ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করেছে।
হেগসেথ জানান, তাঁর নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রতিরক্ষাশিল্পের ভিত্তি পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং বৈচিত্র্যবিষয়ক উদ্যোগগুলো বন্ধ করা হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের কঠোর সমালোচনা করে হেগসেথ বলেন, ‘তাদের নীতিগুলো কাজ করে না। তাই ক্ষমতার প্রদর্শনীর আড়ালে রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ করার প্রতি তাদের আসক্তি প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার চেষ্টায় ঠেলে দেয়। এসবই ব্যক্তিগতভাবে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার রাজনীতি।’