যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের বিপর্যয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের আংশিক দায় স্বীকার করে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে তাঁর মনে কোনো অনুশোচনা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। মঙ্গলবার রাতেই বুথফেরত জরিপের ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ট্রাম্পের দল এই নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কা খেতে চলেছে।
মঙ্গলবার রাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এই শোচনীয় ফলাফলের পেছনে ইরান যুদ্ধের কোনো ভূমিকা ছিল কি না। এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি বলেন, ‘ইরান যুদ্ধও এর একটি কারণ।’
ইরান যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বড় ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তবে নির্বাচনের এই বিপর্যয়কর ফলাফলের মাঝেও তিনি পিট হেগসেথের প্রতি তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৬ সালেও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় ইরাক যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের তীব্র অসন্তোষের কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। সেই ঘটনার পরদিন সকালেই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডকে বরখাস্ত করেছিলেন।
মঙ্গলবার রাতের নির্বাচনের ফলাফলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের যে ক্ষোভ ছিল, তার প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ভরাডুবির পর পিট হেগসেথকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, আমার মনে হয়, তিনি খুব ভালো কাজ করছেন।’ উল্লেখ্য, হেগসেথ ইরান যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
যদিও ট্রাম্প এখন পর্যন্ত হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেননি, তবে রিপাবলিকানরা বর্তমানে তাদের পরাজয়ের কারণগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। ফলে ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুদ্ধের দায়ভারের কারণে হেগসেথকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। ওই উপদেষ্টা বলেন, ‘তাঁকে বরখাস্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। এই যুদ্ধের জন্য কাউকে না কাউকে দায় নিতে হবে। আর আপনারা জানেন, সেই দায় ট্রাম্প কখনো নেবেন না।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পিট হেগসেথকে এই অজনপ্রিয় যুদ্ধের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গত ২৩ মার্চ ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘পিট, আমার মনে হয়, আপনিই প্রথম এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন। আপনি বলেছিলেন, “চলুন, এটা করি। কারণ, তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে দেওয়া যায় না”।’
ভোটের পরদিন বুধবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন যে, ইরান যুদ্ধ আদৌ সার্থক ছিল কি না। তাঁর মতে, এই যুদ্ধের কারণেই রিপাবলিকানদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হয়েছে। এই বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে রয়টার্সকে বলা হয়েছে, হেগসেথের বিষয়ে ট্রাম্পের প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্যগুলো দেখে নিতে।
অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে যে, ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত পেন্টাগনের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে হেগসেথ ‘শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’।
মার্কিন রাজনীতিতে পিট হেগসেথ একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব এবং নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তাঁর অনেক শত্রু রয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা টমাস ম্যাসি চলতি বছরের শুরুতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। ম্যাসির অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে হেগসেথ তাঁর পদের অপব্যবহার করেছেন।
রিপাবলিকান সিনেটর টম টিলিস মঙ্গলবার রাতে সিবিএস নিউজকে জানান, হেগসেথকে ‘জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে’। তাঁর মতে, আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে হেগসেথের টানাপোড়েনের সম্পর্কের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যয় পাসের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নির্বাচনের ফলাফল আসার পর টিলিস বলেন, ‘আমার মনে হয়, নির্বাচনের পর আমাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে, কংগ্রেসের কাছে এসব প্রয়োজনের কথা তুলে ধরার জন্য তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কি না। কারণ, তিনি যদি বর্তমান কংগ্রেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনো কিছু পাস করাতে চান, তাহলে বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।’
উল্লেখ্য, বর্তমান কংগ্রেসের মেয়াদ আর মাত্র ৬০ দিন বাকি আছে।