মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে ইরানে সামরিক হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও তিনি এই পদক্ষেপকে কূটনৈতিক অগ্রগতির লক্ষণ হিসেবে উপস্থাপন করছেন এবং দাবি করছেন যে আলোচনার ইতিবাচক প্রভাবের কারণেই এই বিরতি এসেছে, তবে এটি কোনো ব্যর্থতার স্বীকৃতি নয়। কিন্তু পরিস্থিতির গভীরে বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন এক বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। মূলত শক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্যেই যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা এখন নির্বাচনী সময়ের এক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত যুদ্ধের সবচেয়ে দৃশ্যমান ব্যয় ও প্রভাবগুলো আড়াল করতে চাইছেন প্রেসিডেন্ট। আশঙ্কা করা হচ্ছে, নির্বাচনের পর পুনরায় হামলার পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ওয়াশিংটন অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান থেকে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সামরিক বিকল্পগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং নৌ-অবরোধ বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসন যুদ্ধ শেষ করেনি, বরং নির্বাচনী মৌসুমের কথা মাথায় রেখে এর সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দিকগুলো সাময়িকভাবে লুকিয়ে রেখেছে। এই কৌশলগত ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ফলে রিপাবলিকান প্রার্থীরা নতুন কোনো হামলা বা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক ঝুঁকি ছাড়াই তাদের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যেতে পারছেন। একই সাথে ভবিষ্যতে নতুন করে সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শনের সুযোগও তারা ধরে রাখছেন। প্রকৃতপক্ষে কোনো চূড়ান্ত মীমাংসা হয়নি, সবকিছু কেবল কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে উঠেছিল ব্যয়বহুল এবং অন্তহীন বিদেশি সামরিক অভিযানের বিরোধিতার ওপর ভিত্তি করে। তাঁর 'মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন' বা মাগা আন্দোলনের একটি বিশাল অংশ এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল যে, পূর্ববর্তী মার্কিন নেতারা বিদেশের যুদ্ধে সম্পদ অপচয় করেছেন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে অবহেলা করেছেন। 'আমেরিকা ফার্স্ট' ছিল কেবল ক্ষমতার কথা নয়, বরং অগ্রাধিকারের এক প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ইরান যুদ্ধ সেই প্রতিশ্রুতিকে এখন ভাঙনের মুখে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধের প্রভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভোক্তাদের আস্থা প্রায় রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমে এসেছে।
এর ফলে রিপাবলিকান জোটের অভ্যন্তরে এমন এক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে, যা সামলানো বেশ কঠিন। দলের একদল সমর্থক জাতীয়তাবাদী শক্তি এবং ইরানের প্রতি কঠোর অবস্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে, অন্য একদল সমর্থক এসেছিলেন ব্যয়বহুল যুদ্ধ পরিহার এবং দেশের অর্থনৈতিক সংকট নিরসনের প্রতিশ্রুতিতে। দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চললে এই দুই বিপরীতমুখী পক্ষকে একসঙ্গে সন্তুষ্ট রাখা অসম্ভব। তাই নির্বাচনের আগে হামলা বন্ধ রাখা সেই জটিল হিসাব-নিকাশকে সাময়িকভাবে এড়িয়ে যাওয়ার একটি উপায় মাত্র।
এখানে বড় প্রশ্নটি ট্রাম্প নির্বাচনের আগে কথা রাখবেন কি না তা নিয়ে নয়; বরং প্রশ্ন হলো, ভোট গণনা শেষ হয়ে রাজনৈতিক চাপ কমে গেলে তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন। আগামী সপ্তাহগুলোতে যদি কোনো যাচাইযোগ্য চুক্তি এবং নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ সামনে আসে, তবে এই বিরতি যুদ্ধ অবসানের প্রকৃত প্রথম ধাপ হতে পারে। কিন্তু ৩ নভেম্বর তারিখটিকে যদি রাজনৈতিক বাধা দূর হওয়ার দিন হিসেবে ধরা হয়, তবে এই সংযম মূলত একটি নির্বাচনী চালবাজি হিসেবেই গণ্য হবে।
এখন প্রশ্ন জাগে, এই বিরতি কি সত্যিই শান্তির পথে এক পদক্ষেপ, নাকি অজনপ্রিয় যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য থেকে রিপাবলিকানদের বাঁচানোর চেষ্টা? হামলা হয়তো সাময়িকভাবে থেমেছে, কিন্তু নৌ-অবরোধ এখনো বিদ্যমান, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে এবং স্থায়ী চুক্তির কাছাকাছি কোনো পক্ষই পৌঁছাতে পারেনি। ট্রাম্প জানিয়েছেন যে ৩ নভেম্বরের আগে আর হামলা হবে না, তবে নির্বাচনের পর সামরিক পদক্ষেপে ফেরার সম্ভাবনা তিনি নাকচ করেননি। এই ধারাবাহিকতায় প্রশাসন এই বিরতিকে 'নিয়ন্ত্রিত অগ্রগতি' হিসেবে দেখাতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে রিপাবলিকান প্রার্থীরা জ্বালানির দাম বাড়ার ঝুঁকি ছাড়াই প্রচার চালাতে পারছেন এবং পরবর্তীতে নতুন পদক্ষেপের পথ খোলা রাখছেন।
তবে প্রকাশ্য বার্তার সাথে বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। জানা গেছে, পেন্টাগনকে পুনরায় বড় আকারের অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে আলোচনায় দুই দেশের নির্বাচনের আগেই একটি বড় নতুন অভিযানের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যদিও হোয়াইট হাউস এসব প্রতিবেদনকে মিথ্যা বলে দাবি করছে, তবুও সেনাবাহিনী সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
অজনপ্রিয় বিদেশি যুদ্ধ মাগা-অনুসারীদের ডেমোক্র্যাট বানিয়ে দেবে না ঠিকই, তবে রিপাবলিকানদের জন্য আসল ঝুঁকি হলো ভোটারদের ক্লান্তি। অন্তহীন যুদ্ধ এবং জ্বালানির চড়া দাম হতাশ ভোটারদের ভোট না দিয়ে ব্যালট পেপার রান্নাঘরের টেবিলেই ফেলে রাখার যথেষ্ট কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আক্রমণের আশঙ্কা দূর করে ট্রাম্প চেষ্টা করছেন যেন এই যুদ্ধ রিপাবলিকানদের ব্যর্থতার প্রধান প্রতীকে পরিণত না হয়। তিনি জনমনোযোগ আলোচনার দিকে ঘুরিয়ে দিতে চান। ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সংঘাত তুলনামূলক শান্ত থাকলে রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা যদি কংগ্রেসের এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পায়, তবে সামরিক ব্যয় এবং প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ-ক্ষমতার ওপর নজরদারি আরও বাড়বে।
ঠিক এখানেই আসে ক্ষমতাহীন ব্যালটের প্রশ্ন। নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য হলো নাগরিকদের নামে নেওয়া সিদ্ধান্তে তাঁদের প্রভাব রাখার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু প্রেসিডেন্ট যদি কোনো নীতির খরচ ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত আড়াল করে পুনরায় একই পথে ফিরে যান, তবে সেই গণতান্ত্রিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।
ট্রাম্পের এই কৌশল মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। তখন বিতর্কের বিষয় হবে তিনি যুদ্ধ থেকে সরে আসতে রাজি কি না, তাঁর ইরান নীতি সত্যিই বদলেছে কি না তা নয়। আমেরিকানরা বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয়ের তীব্র চাপ অনুভব করছেন এবং ভোক্তাদের আস্থা মারাত্মকভাবে কমেছে। একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি সেই চাপ বিশেষ করে কমাবে না, আর মূল সংঘাতের সমাধান তো অনেক দূরের কথা। এখানে প্রয়োজন স্থায়ী কূটনৈতিক সমঝোতা, সাময়িক বিরতি নয়—যা একই সমস্যাগুলোকে অমীমাংসিত রেখে দেয়।
রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট, কোনো পক্ষের জয়ই এই কৌশলগত সমস্যার সমাধান আনে না। ইরানেরও নিজস্ব হিসাব রয়েছে।
বড় প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প নির্বাচনের আগে কথা রাখবেন কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, ভোট গোনা শেষ হয়ে রাজনৈতিক চাপ কমে গেলে তিনি কী করবেন। আগামী সপ্তাহগুলোতে যদি যাচাইযোগ্য চুক্তি আর নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ আসে, তাহলে এই বিরতি যুদ্ধ শেষ করার প্রকৃত প্রথম ধাপ হতে পারে। কিন্তু ৩ নভেম্বরকে যদি রাজনৈতিক বাধা উঠে যাওয়ার দিন ধরা হয়, তাহলে এই সংযম মূলত নির্বাচনী চালবাজি হিসেবেই কাজ করেছে।
সে ক্ষেত্রে বিপদ স্পষ্ট। ভোটারদের বলা হচ্ছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার একটি আভাসকে সমর্থন দিতে, অথচ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সব উপায় অক্ষত রয়েছে। তখন ব্যালট হয়ে দাঁড়ায় অন্য কোথাও আগেই নেওয়া সিদ্ধান্তের অনুমোদন।
—গ্রেগ পেন্স, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক।
(দ্য মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া; ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।)