সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, বর্তমান সময়ে দেশে যে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে, তার প্রকৃত পথপ্রদর্শক ছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি নিজেই তাঁর সময়ে এই ঐক্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখিয়ে গিয়েছিলেন।

আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জাতীয় ঐক্য: ৭ই নভেম্বরের চেতনা’ শীর্ষক একটি সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মত ব্যক্ত করেন। ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার (ভিপিএসএসসি) এই সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এম সাখাওয়াত হোসেন। নিজেকে সেই সময়ের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের ভূমিকা ছিল বলে জাসদের যে প্রচারণা রয়েছে, তা সঠিক নয়। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন টু ফিল্ড আর্টিলারির সৈনিকেরা। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ফোর বেঙ্গলের সৈনিকেরা। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর তাঁকে টু ফিল্ড আর্টিলারির কমান্ডিং অফিসারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

৭ নভেম্বরের ঘটনা নিয়ে অনেক বর্ণনা ও বিতর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করেন এম সাখাওয়াত হোসেন। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা জানান, তিনি নিজে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তাই ইতিহাস নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

জিয়াউর রহমানের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণ ব্যাখ্যা করে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জিয়াউর রহমানের সততা, ব্যক্তিত্ব, সাহসিকতা ও নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার ঘোষণা (এই তথ্য নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তার সমাধান ইতিহাসবিদেরা করবেন বলে উল্লেখ করেন বক্তা) দেওয়ার কারণে সেনাবাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ৭ নভেম্বরের পর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তিনি স্বাভাবিকভাবেই জনপ্রিয়তার কেন্দ্রে চলে আসেন।

এম সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের সময় ঢাকায় সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সংখ্যা খুব কমে গিয়েছিল। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। কর্নেল তাহের সেনাবাহিনী থেকে বের হয়ে জাসদে যোগ দেওয়ার পর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, তখন সেনাবাহিনীর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের মধ্যে বড় ধরনের বিভাজন বিদ্যমান ছিল। জিয়াউর রহমান জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন পক্ষকে একত্র করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগকেও (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে সেই ঐক্যের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেছিলেন তিনি। এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, আজ যে জাতীয় ঐক্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা জিয়াউর রহমানই দেখিয়ে গিয়েছিলেন।

দেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আরও সুসংহত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এম সাখাওয়াত হোসেন। তবে এ প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় রাজনৈতিক নেতাদের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের উদাহরণ টেনে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের আধিপত্য এড়াতে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। এ লক্ষ্যে দায়িত্বকালে তিনি তিনবার চীন সফর করেছিলেন।

সেমিনারে ‘কি-নোট স্পিকার’ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম। তিনি তাঁর বক্তব্যে মনে করেন, জাতীয় ঐক্যই বড় বিপর্যয় মোকাবিলার প্রধান শক্তি।

মূল প্রবন্ধে আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, “১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান একই সূত্রে গাঁথা। যখনই জাতি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, তখনই নিজেদের ভেতর থেকে ঐক্যের শক্তি খুঁজে নিয়েছে।”

পুরো সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী এবং সাংবাদিক শওকত মাহমুদ প্রমুখ।