বর্তমান সরকারকে গণভোটের রায় মেনে নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ‘কেয়ারটেকার মানেন নাই?... মেনেছেন। সংস্কার মানেন নাই?...মানতে হবে।’
আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথাগুলো বলেন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াত এই সভার আয়োজন করে।
আলোচনা সভায় জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। তবে এখন তারা সেই গণভোটের রায় মানতে অস্বীকার করছে এবং পুনরায় বাকশালি ধারায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে সেই আয়োজন ষোলো কলায় পূর্ণ হতে চলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনে সবকটি অধ্যাদেশ তোলা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, যেসব অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেত, সেগুলোর মধ্য থেকে ২০টি সরকার বাদ দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের বিষয়ে কথা বলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনসহ সব জায়গায় সরকার দলীয়করণ শুরু করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দখল করা হচ্ছে। দুদকের বর্তমান চেয়ারম্যানের বিষয়ে কথা বলে তিনি বলেন, যাঁকে বসানো হয়েছে তাঁর আমলনামা জাতি ইতিমধ্যে জেনে গেছে; এমন ব্যক্তির মাধ্যমে দুর্নীতি দমন করা অসম্ভব। এছাড়া পিএসসির চেয়ারম্যান ও দুজন সদস্যকে ‘চায়ের দাওয়াত’ দিয়ে বিদায় করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে সরকার এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেগুলোর প্রতিবাদ না করলে বিরোধী দল হিসেবে অর্পিত দায়িত্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। তিনি মনে করিয়ে দেন, এই দেশে বিপ্লব বারবার এসেছে এবং দেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসই তার প্রমাণ।
সরকারকে ভুল পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, সরকার আধিপত্যবাদের বিরোধিতার কথা বললেও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জাতির সামনে স্পষ্ট করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অদৃশ্য কোনো চুক্তি দেশের মানুষ মেনে নেবে না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, সামরিক অফিসাররা তাঁদের প্রতি উপহাস ও অপমানের প্রতিশোধ নিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। এরপর থেকে ওই বছরের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতার ব্যাপক উত্থান-পতন ও পালাবদল ঘটে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটান, তবে সামরিক কর্মকর্তারা সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন।
৭ নভেম্বরের ইতিহাস ব্যাখ্যা করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘৩ থেকে ৬ নভেম্বর জিয়াউর রহমান বন্দী ছিলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর কোনো অবদান নেই, তিনি নিরুপায় ছিলেন। তাঁকে সিপাহিরাই ৭ নভেম্বর মুক্ত করে এনেছিলেন। বিপ্লব সিপাহিরা করেছিল, সংহতি জানিয়েছিল সাধারণ জনগণ। এ জন্যই দিবসটির নাম হয়েছে বিপ্লব ও সংহতি দিবস।’
বিরোধীদলীয় নেতা উল্লেখ করেন, ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে রাষ্ট্রপতি হন এবং বিএনপি গঠনের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যান। তিনি বলেন, ১৯৭১ বা ১৯৭৫ সালে বিএনপি ছিল না, তবে উভয় সময়েই জিয়াউর রহমান ছিলেন। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তাঁকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হলেও আশপাশে থাকা তাঁর দলের কারও কোনো ক্ষতি হয়নি, যা রহস্যময় রয়ে গেছে।
ইতিহাসে প্রত্যেকের অবদান অনুযায়ী স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কারও অবদানকে ছোট করে দেখার পক্ষে নই। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে মারামারিতে আমরা নাই। যিনি ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশ সেটা শুনেছে। আবার স্বাধীনতার পতাকা একজন তরুণ নেতা সেদিন উড়িয়েছিলেন। এটা এখন আর আলোচনায় আসে না। জনাব আ স ম আবদুর রব। তাঁর নামটি কিন্তু কেউ বলে না। বললে নিজের ক্রেডিট চলে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল এম এ জি ওসমানী। তাঁর নামটি কি কেউ এখন মুখে নেয়? এটা নিলে নিজের এবং নিজের দলের কোনো কৃতিত্ব থাকে না। এসব হীনম্মন্যতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যাঁর যেখানে অবদান, তাঁর স্বীকৃতি দিতে হবে।’
ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দিন মোল্লার সঞ্চালনায় এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এছাড়া সভায় বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আবদুর রহমান মূসা ও গোলাম মোস্তফা, সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাত।