একই সময়ে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বর্তমান সরকার। একদিকে সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে, প্রকাশ্যে খুব বেশি তৎপরতা না দেখালেও পর্দার আড়ালে থেকে সরকারকে বিব্রত ও বেকায়দায় ফেলতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দাবিতে রাজপথে সক্রিয় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দল। গত সেপ্টেম্বর মাসে এই জোটের প্রথম লংমার্চ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে জনসভা ও পথসভা আয়োজন করা হয়। এসব কর্মসূচির সভায় বক্তারা প্রয়োজনে সরকার পতনের ‘এক দফার’ ইঙ্গিত দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনামুখী লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছে এই ১১ দল।
জামায়াত জোটের অভিযোগ যে, সরকার জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে। এছাড়া জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে বলে তারা দাবি করছে।
অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ ঝটিকা মিছিল এবং ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনাগুলোতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নাম সামনে আসছে।
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হলেও প্রশাসনের ভেতরে এখনও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ব্যাপক প্রভাব রয়ে গেছে। দলটির অনুগত কর্মকর্তারা সরকারকে সংকটে ফেলতে নানা ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছেন। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আদায়, অপ্রয়োজনীয় লোডশেডিং এবং জনকল্যাণমূলক সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক বিলম্বের মতো ঘটনাগুলোকে ‘পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের’ অপতৎপরতার অংশ হিসেবে দেখছে বিএনপি।
রাজধানীর তাঁতীবাজার এলাকায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত ‘পিচ্চি রাজাকে’ পালাতে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) প্রবীর কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। ঢাকা জেলা আদালত থেকে ২৯ জন আসামিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে প্রিজন ভ্যানটি যখন রাজধানীর তাঁতীবাজার এলাকার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন এই ঘটনা ঘটে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস ভ্যানের চালকের কাছ থেকে চাবি নিয়ে প্রিজন ভ্যানটি খোলেন। এরপর তিনি দরজা খুলে পিচ্চি রাজা ও খায়রুল বাশার নামের আরেক আসামিকে বের করেন। পরবর্তীতে খায়রুল প্রিজন ভ্যানে ফিরে এলেও পিচ্চি রাজা পালিয়ে যান। পুরো বিষয়টি আড়াল করার জন্য পরে এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস একটি নাটক সাজান বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর নওগাঁর বদলগাছী থানার এসআই অসিত কুমারের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উপজেলা সহসভাপতি ও একটি মামলার আসামি রাকিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পালাতে সহায়তা করার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার পর অসিত কুমারকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। বিএনপি এই ধরনের ঘটনাগুলোকে ‘পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের নাশকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বক্তব্য
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, “পতিত ফ্যাসিবাদের দোসররা বিভিন্নভাবে নির্বাচিত সরকারকে গভীর সংকটে ফেলতে এবং দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে চেষ্টা করছে। এসব গোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাই এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”
ডেঙ্গু নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গত বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে লিফলেট বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নেন রুহুল কবির রিজভী। সেখানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী কীভাবে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যায়? এ ঘটনায় মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফ্যাসিবাদের দোসররা সরকারকে সংকটে ফেলতে বিভিন্ন বিভাগে ষড়যন্ত্র করছে।”
রুহুল কবির রিজভী আরও বলেন, “পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দোসররা সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক বিলম্ব ঘটানোসহ নানা উপায়ে সংকট তৈরির ষড়যন্ত্র করছে।”
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বিএনপি সরকার এখন দেশের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করছে। অন্যদিকে পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জামায়াত দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগের নিজেদের জঘন্য কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো অনুশোচনা নেই। তারা মনে করে, মানুষ হত্যা করাসহ তাদের সব কর্মকাণ্ড সঠিক ছিল। প্রকৃতপক্ষে, জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা নিজেরাই জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।”
শামসুজ্জামান দুদু বলেন, “২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বেশ কয়েকটি সংসদীয় আসন পেয়ে জামায়াতের সামনে জনমুখী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড দেশবাসীর প্রত্যাশার বিপরীতে যাওয়ায় তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “এরা সবাই আমাদের নির্বাচিত সরকারকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে। তবে বিএনপি সরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।”
সরকারি দলের অভিযোগের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র ও দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট শুধু জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরছে। কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা সরকারকে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছি। সরকারকে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।”
জনগণের কল্যাণে নেওয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বার্থে জামায়াতে ইসলামী সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।