সচিবালয়ের কর্মী মনোয়ারা বেগম মিরপুর-১৪ নম্বরে সপরিবারে বসবাস করেন। শুক্রবার ছুটির দিনে তিনি তাঁর তিন বছর বয়সী কন্যাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলায়। মেলার এক স্টল থেকে অন্য স্টলে ঘুরে তিনি খুঁজছিলেন মাশরুম-হলুদ ফুল, কিন্তু মেলানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। মেলা শুরুর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই সেই বিশেষ পণ্যটি শেষ হয়ে গিয়েছিল।
মনোয়ারা বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার দুটি শিশুবাচ্চা আছে। বাজার থেকে ওদের জন্য যখন কেনাকাটা করি, বারবার মনে হয় ওদের বিষ কিনে খাওয়াচ্ছি। এ মেলায় আমি প্রতিবছর আসি, বাজার করি। একটা বিশ্বাস আছে, পাহাড়ের জুমচাষিদের এসব ফল-সবজি আমাদের সমতল থেকে অনেকাংশে নিরাপদ।’
রাজধানীর মিরপুর-১৩ নম্বরে অবস্থিত পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী পঞ্চম আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা। উন্নয়ন সংগঠন নাগরিক উদ্যোগ এবং ‘আদিবাসী সুহৃদদের’ যৌথ প্রচেষ্টায় আয়োজিত এই মেলায় পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাদ্যদ্রব্য, শস্য এবং নানা পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয় চলছে। আগামীকাল শনিবার পর্যন্ত এই মেলার কার্যক্রম চলবে।
মেলায় দর্শনার্থীরা পাহাড়ের জনপ্রিয় খাবার যেমন কলাপাতায় রান্না করা বিভিন্ন পদের হেবাঙ, জুম চাষের সবজি এবং পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পাজন খুঁজে পাচ্ছেন। এছাড়া প্রদর্শিত হয়েছে কাপ্তাই লেকের মাছ। সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাবারের সমাহারও এখানে রয়েছে; বিশেষ করে মণিপুরি, গারো ও রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা তাঁদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পণ্য নিয়ে অংশ নিয়েছেন।
রাখাইন সম্প্রদায়ের স্টলে প্রদর্শিত হচ্ছে সাদা ও কালো বিন্নি চালের তৈরি বিভিন্ন প্রকার পিঠা। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মুন্ডিও পাওয়া যাচ্ছে মেলায়। খাবারের পাশাপাশি আদিবাসীদের উৎপাদিত নানা শস্য ও হস্তজাত পণ্যও বিক্রি করছেন বিক্রেতারা।
নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সংস্কৃতিকর্মী তনয়া দেওয়ান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। এছাড়া বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকারকর্মী ও নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান শিরীন পারভীন হক এবং অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীপেন দেওয়ান বলেন, “আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস তুলে ধরতে যাঁরা এ মেলার আয়োজন করেছেন, তা প্রশংসনীয়। এ মেলা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। এটি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি মাধ্যম। বাংলাদেশে অসংখ্য জাতিসত্তার মানুষের বসবাস, সেই বৈচিত্র্যের চিত্রও এ মেলায় ফুটে উঠছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে তাঁদের জীবনধারা, চিন্তাভাবনা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। এগুলো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ। যুগ যুগ ধরে এসব ঐতিহ্য দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সবাইকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমানভাবে বিবেচনা করার যে প্রত্যাশা, তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে কাজে। বর্তমান সরকার ‘রেইনবো নেশন’-এর কথা বলেছে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের সেই প্রত্যাশা যেন শুধু কথায় সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।”
নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে দীপেন দেওয়ান বলেন, “আদিবাসীদের খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি জড়িত। জুমচাষে রাসায়নিক উপাদান ছাড়াই বিভিন্ন ফসল ও ফলমূল উৎপাদিত হয়। জুমের ধানের পাশাপাশি নানা ধরনের ফলন হয়। এসব পণ্য বাজারজাত করা গেলে জুমচাষিরা উপকৃত হবেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।” তিনি এই বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার কথা জানান।
তিনি আরও বলেন, “আদিবাসী খাদ্যাভ্যাস, জুমচাষ ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব ছিল, নাগরিক উদ্যোগ সেই উদ্যোগ নিয়েছে।” আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, মেলা থেকে যা শিখেছেন তা প্রচার ও প্রসারে নিজের দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করবেন।
শিরীন পারভীন হক তাঁর বক্তব্যে বলেন, “এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশে বহুজাতি ও বহুসংস্কৃতির মানুষের বসবাসের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। দেশে খাদ্যে ভেজালের যে ছড়াছড়ি, সেখানে নিরাপদ খাদ্যের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের খাদ্যপণ্য এখনো নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত রয়েছে। নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা সংরক্ষণের পাশাপাশি আদিবাসীদের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা বাঞ্ছনীয়।”
তিনি ভূমির অধিকারের কথা উল্লেখ করে বলেন, “পাহাড়ের মানুষের খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে ভূমির বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু তাঁদের ভূমির অধিকার এখনো স্বীকৃত নয়। প্রতিনিয়ত তাঁদের ভূমি দখল হচ্ছে। ফলে উৎপাদনব্যবস্থা থেকে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের যথাযথ ও কার্যকর দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। আদিবাসীদের উৎপাদিত খাদ্যশস্য ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
মেইনথিন প্রমীলা বলেন, “আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ। আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবার থেকে শুরু করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা মানুষের কাছে তুলে ধরতে এ মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নিরাপদ খাদ্যের যে ব্যবস্থা, তা আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যেই দেখা যায়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আদিবাসীদের খাদ্য উৎপাদনপদ্ধতি সংরক্ষণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তাঁদের খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে ভূমির বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে। তাই ভূমির অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের নজর দেওয়া দরকার। এতে আদিবাসীদের খাদ্য ও শস্য দেশের বহুমাত্রিক খাদ্যব্যবস্থা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।”
সভাপতির বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, “আদিবাসীরা দেশের বাইরের কেউ নন, তাঁরা এ দেশেরই অংশ। তাঁদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব।” তিনি ঢাকায় আদিবাসীদের পণ্যের জন্য আলাদা বাজার তৈরির দাবি জানান এবং বলেন, এ ধরনের ছোট উদ্যোগ আদিবাসী সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে সাহায্য করবে।
আলোচনা শেষে প্রধান অতিথি দীপেন দেওয়ান ও অন্যান্য অতিথিরা বেলুন উড়িয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই মেলা। দুই দিনই সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে গান পরিবেশন করবেন বাংলাদেশ আইডল মং উ চিং মারমা, বর্ষা চাকমা, বুলু তঞ্চঙ্গ্যা ও মার্কুস চিসিম। এছাড়া পরিবেশিত হবে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য।