বান্দরবান জেলা শহরের নীলাচল পর্যটনকেন্দ্র–সংলগ্ন টাইগারপাড়া এলাকায় পাখি ও বন্য প্রাণীদের খাদ্য নিরাপত্তায় একটি অনন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রিন মিলিউ ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের সদস্যরা পাহাড়ি ৬০ শতক জমিতে ‘পাখির জুম’ নামে জুমচাষ শুরু করেছেন। এ বছরই প্রথমবারের মতো এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর লক্ষ্য স্পষ্ট—উৎপাদিত সকল ফসল মানুষের জন্য নয়, বরং পাখি ও বন্য প্রাণীদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

বর্তমানে ধান, ভুট্টা, মারফা, চিনার (জুমের বাঙ্গি), তিল-তিসি, মরিচসহ নানা ফসল ফলেছে। ধানগাছে শিষ ও কাউনের ছড়া দেখা গেছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ধানের খেত সোনালি রঙ ধারণ করবে। ভুট্টাগাছে ফুল এসেছে, যা পাখিদের খাবার হবে। অন্যদিকে, বরবটি, শিম ও ঢ্যাঁড়স খাবে কাঠবিড়ালি ও ইঁদুর। মারফা, চিনার ও আলুসহ অন্যান্য ফসল বনের স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ভক্ষণ করবে। জুমের আশপাশে ফলদ-বনজ বাগান ও বনের ঝোপঝাড় থাকায় হরেক রকমের পাখপাখালির আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে পাখিরা এখানে ভিড় করে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের তরুণ-তরুণীরা।

ভালো ফলন ও বরকত কামনায় গত বুধবার মারমাদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে ‘আবংমাহ (লক্ষ্মী) পূজা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। একজন পুরোহিতের নেতৃত্বে জুমের মাঝখানে বাঁশের খুঁটির ওপর মাচাংয়ের বেদি তৈরি করে ফল-ফুল, মুড়িমুড়কি ও মিষ্টান্ন সাজানো হয়। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে ফসলের উন্নতি ও প্রাণীদের মঙ্গল কামনা করা হয়। আবংমাহ পূজার পুরোহিত মংচিং মারমা বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন, ধনের দেবীকে মারমারা বলেন আবংমাহ। মারমাদের বিশ্বাস, তাঁর পূজা করলে জুমের ফসলের ফলন ভালো ও বরকত হয়। এটি শুধু বিশ্বাস নয়, প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবনব্যবস্থার একটি অংশ। পাহাড়ের মানুষ গাছ, পাথর ও নদীর পূজা করে। কারণ, এগুলো জীবনের অংশ।

গ্রিন মিলিউ ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের সাধারণ সম্পাদক পুসাইনু মারমা জানান, তাঁরা বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন নামে এক কর্মসূচি হাতে নেওয়ার মাধ্যমে প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে জনসচেতনতামূলক কাজ করেন। তারই অংশ হিসেবে পাখির জুম নামে পাখি ও বন্য প্রাণীর জন্য জুমচাষ করছেন। জুমের ফসল শুধু পাখিরা নয়, একেক প্রজাতির বন্য প্রাণী একেক ধরনের ফসল খাবে। উৎপাদিত কোনো ফসল আহরণ করা হবে না; অর্থাৎ উৎপাদিত সবকিছুর মালিক পাখি ও বন্য প্রাণী এবং সবকিছু খাবেও তারা।

চসিংপ্রু মারমা ওরফে চোপ্রু, যিনি পাখির জুমের সমন্বয়কারী, জানান, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, এর সঙ্গে পাখি ও বন্য প্রাণীর খাবারে সংকট প্রকট হচ্ছে। এর ফলে বন্য প্রাণীরা খাবারের সংকটে হয় অন্যত্র চলে যাচ্ছে, নয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। জেলা ও উপজেলা শহরের আশপাশে এই সংকট আরও বেশি। এ জন্য প্রাণীদের খাবারের সংকটে সহমর্মী হয়ে সহযোগী হওয়ার জন্য পাখির জুম করা হয়েছে।