শরীয়তপুর জেলা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহ্যবাহী পালং খাল দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখল ও দূষণের কবলে পড়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হওয়ায় এটি এখন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকির কারণে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যার সমাধান এবং খালটি পুনরুদ্ধারে সরকারি উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের নেতৃবৃন্দ।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা পালং খালের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা খালের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে, দখল ও দূষণের কারণে পানিপ্রবাহ কীভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। পরিদর্শন শেষে তারা দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে খালটি পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, একসময় পালং খাল ছিল শরীয়তপুর শহর ও আশপাশের এলাকার পানি নিষ্কাশন ও কৃষিকাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। কীর্তিনাশা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত এই খালে সারা বছরই পানির প্রবাহ সচল থাকত। তখন এখান দিয়ে বিভিন্ন ধরনের নৌযান চলাচল করত এবং নদীর পানি আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত। সেই পানি ব্যবহার করে শহরের পাকার মাথা, আমতলি, কাগদী ও বুড়িরহাটসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা কৃষিকাজ পরিচালনা করতেন।
তবে সময়ের সাথে সাথে খালের দুই পাড় দখল, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং পানিপ্রবাহের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরির কারণে এর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হয়েছে। একসময় যে খালে নৌযান চলাচল করত, বর্তমানে সেটির অনেক অংশই সংকুচিত ও আবর্জনায় পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও খালের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
খালের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। খালের যেসব অংশে সামান্য পানি রয়েছে, সেখানেও ময়লা-আবর্জনা জমে আটকে থাকছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি বাড়ছে মশা-মাছির উপদ্রব। দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থা চলতে থাকলে পানিদূষণ ও জলাবদ্ধতাসহ নানা ধরনের পরিবেশগত সমস্যা আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরিদর্শনের সময় বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের নেতৃবৃন্দ বলেন, একটি জলপথ শুধু পানিপ্রবাহের মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে এলাকার পরিবেশ, কৃষি, জনজীবন ও অর্থনীতি জড়িত। পালং খাল কীর্তিনাশা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় এর পানিপ্রবাহ সচল করা হলে একদিকে যেমন শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে পারে, অন্যদিকে আশপাশের কৃষিজমিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তারা আরও বলেন, খালটির বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। দখলদারদের চিহ্নিত করে খালের সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ উচ্ছেদ, ময়লা-আবর্জনা অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় স্থানে পুনঃখননের মাধ্যমে খালটির পুরোনো প্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
নদী পরিব্রাজক দলের পক্ষ থেকে পালং খালকে সরকারের চলমান খাল খনন কর্মসূচির আওতায় এনে দ্রুত পুনঃখননের দাবি জানানো হয়। প্রয়োজন হলে খাল রক্ষায় কঠোর আন্দোলনের পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন সংগঠনটির নেতারা।
বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সভাপতি মোহাম্মদ নুরুজ্জামান শিপন বলেন, "দীর্ঘ ১০ বছর ধরে পালং খাল নিয়ে কথা বলে আসছি, কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ফলাফল পাইনি। আজ বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মনির হোসেন ও স্থানীয়দের নিয়ে খালটি পরিদর্শন করেছি। পালং শহরের হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত এই খালটি দখল ও দূষণমুক্ত করে আমরা পুনরুদ্ধার করতে চাই। খালটির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে এনে নতুন করে সচল করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও কার্যক্রম চালিয়ে যাব।"
বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নুরুজ্জামান শিপনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ইসলাম মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি ও সাহিত্যিক শ্যামসুন্দর দেবনাথ, বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু হেনা মোস্তফা কামাল, নির্বাহী সদস্য ও কক্সবাজার জেলার সভাপতি আবু নোমান, সৈয়দ মাহমুদুল হক, শরীয়তপুর জেলার সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান, গাজীপুর জেলার সেক্রেটারি আশিকুর রহমান, শরীয়তপুর জেলার সভাপতি ওলিউর রহমান রাজু মাঝি, সেক্রেটারি কাজী মোজাম্মেল হক মামুনসহ জেলা কমিটির সকল নেতৃবৃন্দ ও সচেতন নাগরিকরা।