আগামীকাল শুক্রবার থেকে রাজধানীর মিরপুরে পঞ্চমবারের মতো শুরু হতে যাচ্ছে আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা। দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনে প্রদর্শিত হবে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবার, জুমের ফসল, পাহাড়ি মধু এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্য। আগামী শনিবার পর্যন্ত চলবে এই মেলা। মিরপুর ১৩ নম্বরে অবস্থিত পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে মেলার যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে।
পাহাড়ের বাঁশকোঁড়ল, কলাপাতায় রান্না করা বিশেষ খাবার, জুমের তাজা শাকসবজি কিংবা সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যের নানা পদ—সবকিছুর স্বাদ ও বৈচিত্র্য এখন এক জায়গায় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে ঢাকা শহরে। মূলত আদিবাসীদের সমৃদ্ধ খাদ্যসংস্কৃতি, কৃষিপণ্য ও ঐতিহ্যবাহী শস্যের সঙ্গে নগরবাসীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই পঞ্চম আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
উন্নয়ন সংগঠন নাগরিক উদ্যোগ এবং আদিবাসী সুহৃদদের যৌথ প্রচেষ্টায় আয়োজিত এই মেলায় পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করছেন। আয়োজক কমিটির সদস্য রেলী চাকমা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্টল বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলের পাশাপাশি সমতলের মান্দি, মণিপুরি, সাঁওতাল ও রাখাইন জনগোষ্ঠীর অনেক উদ্যোক্তা ইতিমধ্যে স্টল বুকিং দিয়েছেন।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বরাদ্দকৃত স্টলগুলোর মধ্যে আদিবাসী নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
মেলায় থাকছে পাহাড় ও সমতলের নানা খাবারের সমাহার
আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী রান্নার নানা পদ এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ। এসব খাবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, অনেক পদই তেল ও মসলা ছাড়াই তৈরি করা হয়। খাবারের তালিকায় থাকছে পাহাড়ের জনপ্রিয় বাঁশকোঁড়ল, কলাপাতায় রান্না করা বিভিন্ন ধরনের হেবাং, জুমের শাকসবজি এবং পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পাজন।
অন্যদিকে, সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাবারের মধ্যে মণিপুরি, গারো ও রাখাইনদের বিশেষ পদগুলো স্থান পেয়েছে। রাখাইন উদ্যোক্তারা কালো ও সাদা বিন্নি চাল দিয়ে তৈরি নানা ধরনের পিঠা নিয়ে আসবেন। এ ছাড়া মেলায় পাওয়া যাবে বিভিন্ন ধরনের মুন্ডি। টাটকা ফল দিয়ে তৈরি ঝাল খাবার লাকসোও থাকবে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে। মণিপুরি খাবারের তালিকায় থাকছে ডাল দিয়ে তৈরি বিশেষ পদ উতি এবং বিন্নি চাল ও দুধ দিয়ে তৈরি ক্ষীরজাতীয় খাবার সাঙ্গোম। বিভিন্ন জাতের বিন্নি চালের পাশাপাশি পাওয়া যাবে খাঁটি পাহাড়ি মধুও।
কৃষিপণ্য ও শস্যের প্রদর্শনী
কেবল রান্না করা খাবারই নয়, মেলায় পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন এলাকার কৃষিপণ্য প্রদর্শিত হবে। উদ্যোক্তারা নিয়ে আসবেন জুমে উৎপাদিত বিষমুক্ত শাকসবজি, পাহাড়ি কলা, মধুপুরের আনারস, পেঁপেসহ বিভিন্ন ধরনের ফলমূল। এছাড়া থাকবে বৈচিত্র্যময় শস্য, শুঁটকি এবং কাপ্তাই হ্রদের মাছ।
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, “শহরের মানুষের সঙ্গে আদিবাসীদের সমৃদ্ধ জুমচাষ, বৈচিত্র্যময় শস্য ও খাদ্যসংস্কৃতির পরিচয় ঘটানোই এ মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য। আদিবাসী উদ্যোক্তারা যাতে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য আরও বেশি ভোক্তার কাছে তুলে ধরতে পারেন, সে লক্ষ্যেও এ আয়োজন।” তিনি আরও জানান, টানা পাঁচ বছর ধরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে এটি রাজধানীর মানুষের কাছে বেশ পরিচিতি পেয়েছে।
আয়োজক দলের আরেক সদস্য মেইনথিন প্রমীলা বলেন, “দেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস। এই খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও মেলবন্ধন তৈরি করাই মেলার অন্যতম লক্ষ্য।” পাশাপাশি আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের চর্চায় থাকা বিষমুক্ত কৃষিপণ্য সম্পর্কে নগরবাসীকে সচেতন ও পরিচিত করতে চান তাঁরা।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক আয়োজন
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ায় দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম হবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলাটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শুক্রবার সকাল ১০টায় মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় আয়োজন করা হবে বিশেষ আদিবাসী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে সংগীত পরিবেশন করবেন বাংলাদেশ আইডল মং, বর্ষা চাকমা, বুলু তঞ্চঙ্গ্যা ও গারো শিল্পী মার্কুস চিসিম। পাশাপাশি পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশনা প্রদর্শিত হবে।
মেলায় পৌঁছানোর জন্য মেট্রোরেলের মিরপুর ১০ স্টেশন থেকে রিকশায় প্রায় পাঁচ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে যাওয়া যাবে।