কোন কৃষকের কতটুকু জমি, তার জন্য কী পরিমাণ সার বরাদ্দ, আগে তিনি কতটুকু নিয়েছেন এবং কোন ডিলারের কাছে কত সার মজুত রয়েছে— এসব তথ্য জানতে এখন আর দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে না। কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করলেই মিলছে প্রয়োজনীয় সব হিসাব। একই প্ল্যাটফর্মে দেখা যাচ্ছে ডিলারদের বরাদ্দ, মজুত ও সার বিতরণের তথ্যও। এর ফলে অন্যের বরাদ্দের সার তোলার সুযোগ কমার পাশাপাশি সহজ হচ্ছে পুরো প্রক্রিয়ার তদারকি।

জামালপুরের বকশীগঞ্জে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় এমন আমূল পরিবর্তন এনেছে ‘সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম’ নামের একটি ওয়েবসাইট। আর এই উদ্ভাবনী ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছেন উপজেলার একাদশ শ্রেণির এক মেধাবী শিক্ষার্থী হৃদয় হাসান রাফি। মাত্র ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে এবং চার মাসের নিরলস প্রচেষ্টায় তৈরি এই ওয়েবসাইটটি ইতিমধ্যে তিন জেলার চারটি উপজেলার কৃষি অফিসে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কৃষি উৎপাদনে সময়মতো সার পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সার বিতরণে বরাদ্দ, মজুত ও প্রকৃত চাহিদার হিসাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা জটিলতা বিদ্যমান ছিল। প্রায়ই দেখা যেত, একজন কৃষকের নামে বরাদ্দ করা সার অন্য কেউ তুলে নিচ্ছেন, যার ফলে প্রকৃত কৃষককে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতো। অন্যদিকে, ডিলারদের মজুত ও বিতরণের হিসাব তদারকিতেও কৃষি কর্মকর্তাদের নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হতো। বকশীগঞ্জেও ঠিক এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সার ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়।

রাফির তৈরি এই ওয়েবসাইটে কৃষক, ডিলার, সারের বরাদ্দ, মজুত ও বিতরণসহ মোট সাত ধরনের তথ্য সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করলে তার জমির পরিমাণ, কী পরিমাণ সার পাওয়ার কথা এবং আগে কতটুকু সার সংগ্রহ করেছেন, তা মুহূর্তেই জানা যায়। ফলে নির্দিষ্ট কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার অন্য কেউ নিতে গেলে তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

শুধু কৃষকের তথ্যই নয়, ডিলারভিত্তিক সারের বরাদ্দ ও মজুতের হিসাবও রাখা হচ্ছে একই প্ল্যাটফর্মে। কোন ডিলারের কাছে কতটুকু সার রয়েছে, কতটুকু বিতরণ হয়েছে এবং কোথায় কত সার যাচ্ছে তা কার্যালয়ে বসেই পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন কৃষি কর্মকর্তারা। আগে এসব তথ্য পেতে বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই করতে হতো এবং মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিতে হতো। এখন এক জায়গা থেকেই প্রয়োজনীয় সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এতে সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি অনিয়ম, অবৈধ মজুত ও সার পাচার প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সার বিতরণে বিদ্যমান অনিয়ম ও হিসাবের জটিলতা দেখেই এই ওয়েবসাইট তৈরির চিন্তা করেন হৃদয় হাসান রাফি। প্রায় চার মাসের কঠোর পরিশ্রমে এবং ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে এটি তৈরি করেন তিনি।

এ বিষয়ে রাফি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সার নিয়ে চলমান সমস্যাগুলো দেখেই এটি তৈরির চিন্তা মাথায় আসে। ওয়েবসাইটটি তৈরি করতে প্রায় চার মাস সময় লেগেছে। শুরুতে খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকার মতো। এর মাধ্যমে কৃষি কর্মকর্তারা কোন এলাকায় কতটুকু সার রয়েছে, কারা পাচ্ছেন এবং কার কতটুকু বরাদ্দ সব তথ্য এক ক্লিকেই জানতে পারবেন। সব মিলিয়ে সাত ধরনের তথ্য পাওয়া যাবে এই ওয়েবসাইট থেকে। এছাড়া আরও আপডেট করে কিছু নতুন ফিচার যুক্ত করা যেতে পারে। আমার মূল লক্ষ্য, কৃষকেরা যেন তাদের প্রাপ্য সার পান। ইতিমধ্যে চারটি উপজেলা থেকে ভালো সাড়া পেয়েছি। আরও অনেক উপজেলা এটি ব্যবহারের আগ্রহ দেখিয়েছে।”

ওয়েবসাইটটি চালুর পর কৃষকেরা নিজেদের বরাদ্দের হিসাব সহজে জানতে পারছেন। অন্যের বরাদ্দের সার নেওয়ার সুযোগ কমায় ডিলার পয়েন্টেও বিশৃঙ্খলা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ডিলারদের মজুত ও বিতরণের হিসাব রাখাও এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।

বকশীগঞ্জের কৃষক মতিন বলেন, “আগে সার সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হতো। কখনো প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যেত না, আবার কখনো ডিলারের কাছে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হতো। এখন জমির পরিমাণ অনুযায়ী সারের হিসাব থাকায় প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করা অনেক সহজ হয়েছে।”

কৃষক বদিউজ্জামান বলেন, “আমাদের এলাকার ছেলে হৃদয় চমৎকার একটি জিনিস বানিয়েছে। সেখানে আমার জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে অনুসন্ধান করলেই দেখা যায়, আমি কতটুকু সার পাব। আগে আমার বরাদ্দের সার অন্যজন নিয়ে যেত। এখন চাইলেও কেউ তা নিতে পারবে না। এই ব্যবস্থা চালু হওয়ায় আমাদের অনেক ভোগান্তি কমেছে।”

সার ডিলার ছোটন মিয়া বলেন, “আগে সারের মজুত ও বিতরণের হিসাব সংরক্ষণে বাড়তি ঝামেলা ছিল। একজনের সার আরেকজন নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে নানা সমস্যা হতো। এখন জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে অনুসন্ধান করলেই একজন কৃষকের জমির পরিমাণ, তার বরাদ্দ এবং আগে কতটুকু সার নিয়েছেন তা দেখা যায়। কোনো কৃষকের বরাদ্দ ১০০ কেজি হলে তিনি ঠিক সেই পরিমাণ সারই পাবেন। এতে অন্যের বরাদ্দের সার নেওয়ার সুযোগ কমে গেছে।”

বকশীগঞ্জে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন আর একটি উপজেলায় সীমাবদ্ধ নেই। জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর এবং রাঙামাটির লংগদু উপজেলার কৃষি অফিসে এই ওয়েবসাইট ব্যবহার করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে এর সুফল পাওয়ায় অন্যান্য উপজেলাতেও এর প্রতি ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বকশীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে ওয়েবসাইটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে কৃষকের জমির পরিমাণ অনুযায়ী সারের চাহিদা, ডিলারদের বরাদ্দ, মজুত ও বিতরণের তথ্য সহজেই পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। আমরা অফিসেই বসেই সব তথ্য পেয়ে যাচ্ছি। ফলে অনিয়ম, অবৈধ মজুত ও সার পাচার রোধে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে অন্য কয়েকটি উপজেলাতেও এটি ব্যবহার করা হচ্ছে।”