কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অন্যতম পথিকৃৎ জিওফ্রে হিন্টন মনে করেন, মানবজাতির মঙ্গলের কথা চিন্তা করলে এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন না করলেই হয়তো ভালো হতো। এআই জগতের 'গডফাদার' হিসেবে পরিচিত এই বিজ্ঞানীর আশঙ্কা, এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে চলতি বছর অথবা আগামী বছরের মধ্যেই বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তিনি সতর্ক করে জানিয়েছেন, এআই ব্যবহার করে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় সাইবার হামলা চালানো কিংবা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার মতো মারাত্মক ঘটনাও ঘটতে পারে।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নোবেলজয়ী এই কম্পিউটারবিজ্ঞানী তাঁর এসব আশঙ্কার কথা বিস্তারিতভাবে ব্যক্ত করেন। তবে এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ হতাশ নন। তাঁর বিশ্বাস, এই প্রযুক্তি মানবসভ্যতার জন্য সমৃদ্ধির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এআইয়ের সাথে জড়িত ঝুঁকিগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

৭৮ বছর বয়সী হিন্টনের ধারণা, আগামী এক দশকের মধ্যে, কিংবা তারও আগে মানবজাতি বুঝতে পারবে যে এআইয়ের ঝুঁকিগুলো সামলে এর সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব কি না। যদি ঝুঁকি মোকাবিলায় সফল হওয়া যায়, তবে এআইয়ের কল্যাণে পৃথিবীতে বিপুল প্রাচুর্য তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, এই প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান আরও বাড়বে, দেখা দেবে ব্যাপক বেকারত্ব এবং সাংস্কৃতিক সংকট। এমনকি বর্তমান সামাজিক কাঠামোটি পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

এআই নিয়ে বিশ্বের বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার তীব্র প্রতিযোগিতার তীব্র সমালোচনা করেছেন হিন্টন। তাঁর মতে, বাজারে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার লড়াইয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি ও বাজারে ছাড়ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে তাদের যথেষ্ট আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্যাম অল্টম্যানের ওপর তাঁর কোনো আস্থা নেই বলেও জানান হিন্টন। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, মার্ক জাকারবার্গ, ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যান তাঁরা সবাই এআইয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন। কিন্তু এসব নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমার ধারণা, মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে অর্থ উপার্জনই তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা হিন্টন বড় হয়েছেন ব্রিস্টলে। তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠান চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আরও শক্তিশালী মডেল তৈরির চেষ্টা করছে। হিন্টনের মতে, এই প্রতিযোগিতার নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ওপেনএআইয়ের মতো একটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে স্যাম অল্টম্যানের অবস্থান তাঁকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে।

দীর্ঘ প্রায় ৪৪ বছর ধরে এআই নিয়ে নিরলস গবেষণা করে আসছেন হিন্টন। সত্তরের দশকে তিনি কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। মানুষের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি থেকে অনুপ্রাণিত এই গাণিতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কম্পিউটার তথ্য থেকে শিখতে পারে এবং অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়। আধুনিক এআই প্রযুক্তির সামগ্রিক বিকাশে তাঁর এই গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৩ সালে এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো নিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলার জন্য তিনি গুগলের চাকরি ছেড়ে দেন। সে সময় তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, এআই যদি আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

হিন্টনের আশঙ্কা, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছর এআইয়ের কারণে চেরনোবিলের মতো ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, ‘এমন কিছু ঘটলে হয়তো মানুষ বিষয়টিকে সত্যিকার অর্থে গুরুত্ব দিতে শুরু করবে। আমার অন্তর্দৃষ্টি বলছে, এখনো নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই রয়েছে। আমরা চাইলে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারি। তবে এ জন্য বড় ধরনের প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আমার বিশ্বাস, আমরা সেই প্রচেষ্টা চালাতে পারব।’