সহপাঠীরা যখন তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায় ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক সেই সময়েই পুকুরের জলে ভাসছিল আদনান আলতাফের (২৬) নিথর দেহ। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের নাগরিক এই শিক্ষার্থী কুমিল্লার বেসরকারি ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করতেন। জানা গেছে, ‘মানসিক অসুস্থতার’ কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনায় পিছিয়ে ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। ছেলের পরীক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাশে থাকার জন্য ভারত থেকে কুমিল্লায় এসেছিলেন তাঁর মা নিঘাত বেগম। তবে শেষ পর্যন্ত আর পরীক্ষা দিতে পারেননি আদনান।

নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর গত বুধবার সকালে কলেজের নিকটস্থ একটি পুকুর থেকে পুলিশ আদনানের মরদেহ উদ্ধার করে। এই ঘটনায় বুড়িচং থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনে যান চট্টগ্রামে কর্মরত ভারতীয় হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (কনস্যুলার ও শিক্ষা) মৃন্ময় কুমার সিং (এম কে সিং)। তিনি আদনানের শোকসন্তপ্ত মা এবং কলেজে অধ্যয়নরত অন্যান্য ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। পাশাপাশি কলেজের শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন তিনি। এরপর আদনানের ব্যবহৃত ছাত্রাবাস, খাবার খেতে যাওয়া হোটেল এবং যে পুকুর থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই স্থানগুলো পরিদর্শন করেন তিনি।

আদনান আলতাফ ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর অনেক সহপাঠী ইতিমধ্যে ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেছেন, কেউ কেউ ইন্টার্নশিপও শেষ করেছেন। তবে পড়াশোনায় দীর্ঘসূত্রতা ও পিছিয়ে থাকার কারণে আদনানের স্নাতক শেষ করা সম্ভব হয়নি।

কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, প্রথম পেশাগত পরীক্ষায় আদনান একবারে উত্তীর্ণ হলেও দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষায় পাস করতে তাঁর তিনবার চেষ্টা করতে হয়েছে। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে তৃতীয় পেশাগত পরীক্ষায় অংশ নিলেও তিনি সফল হননি। একই বছরের নভেম্বরের পরীক্ষাতেও তিনি অকৃতকার্য হন।

করোনা মহামারীর সময়ে অনলাইনে ক্লাস চললেও আদনান পরীক্ষায় অংশ নেননি, যার ফলে তিনি আরও পিছিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে মানসিক অসুস্থতা ও অন্যান্য জটিলতার কারণে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করান। তবে সেই চিকিৎসার পরও তিনি পড়াশোনায় নিয়মিত হতে পারেননি।

ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ জাকিরুল ইসলামের ভাষ্য, “মেডিকেলের পড়াশোনার চাপ সামলাতে পারছিলেন না আদনান। এ কারণে তিনি হতাশাগ্রস্ত ছিলেন।”

আদনানের মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তাঁর মা নিঘাত বেগম কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে শান্তি-সুনীতি ছাত্রীনিবাসের একটি কক্ষে অবস্থান করতেন। আদনান থাকতেন ছেলেদের ছাত্রাবাসে। অসুস্থ ছেলের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে মা সবসময় তাঁর পাশে থাকতেন। এর আগে আদনানের বাবা আলতাফ হোসাইন রাতাও ছেলের দেখাশোনার জন্য কয়েক মাস কুমিল্লায় অবস্থান করেছিলেন বলে কলেজ সংশ্লিষ্টরা জানান।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার রাতে আদনান কলেজ সংলগ্ন বিসমিল্লাহ হোটেলে খাবার খেতে যান। সেই সময় তিনি ভুলবশত তাঁর মুঠোফোনটি হোটেলে ফেলে আসেন। পরে মায়ের কাছে গিয়ে ফোনের কথা জানালে মা তাঁকে সেটি নিয়ে আসতে বলেন। এরপর হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে আদনানের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আদনান মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন বলে দাবি করে তাঁর মা নিঘাত বেগম বলেন, “সে পরীক্ষা দিতে চাইত না। আমি পরীক্ষার সময় তাঁর পাশে থাকতে এসেছি। ছেলেকে চোখে চোখে রেখেছিলাম। এখন আমি বাড়ি গিয়ে আদনানের বাবাকে কী জবাব দেব?”

ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে বর্তমানে ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ প্রায় ২৭০ জন ভারতীয় শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাঁদের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীর, মেঘালয়, মহারাষ্ট্র, কেরালা, আসাম, মণিপুর, পশ্চিমবঙ্গ ও গুজরাটের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন।

গতকাল বিকেলে এই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের নিরাপত্তা ও সার্বিক খবরাখবর নেন ভারতীয় হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি মৃন্ময় কুমার সিং। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমি মূলত এসেছি ভারতের অন্য শিক্ষার্থীদের মনোবল বাড়াতে। তাঁদের পাশে ভারত সরকার আছে—এটা জানাতে। ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখতে। এখানে এসে দেখলাম এই প্রতিষ্ঠান ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বিষয়ে খুবই যত্নবান। তবু এই মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

পরিদর্শনকালে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ মো. সেলিম, পরিচালক খোরশেদ আলম ও জাকিরুল ইসলাম, উপাধ্যক্ষ পীযূষ কর্মকার এবং বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমানে আদনানের মরদেহ ঢাকার একটি হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরের কার্যকারিতা না থাকায় লাশটি ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। ভারতীয় হাইকমিশন প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। ছেলের লাশ নিয়ে দেশে ফিরবেন নিঘাত বেগম।

বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফুর রহমান জানান, আদনানের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।