দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে টানা সড়ক অবরোধের ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। পর্যটনের ভরা মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও এই অবরোধের কারণে পর্যটকদের যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে পর্যটন ব্যবসায় চরম ধস নেমেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাজেকে এখন খাদ্যসংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই সংকটের প্রভাব কেবল সাজেকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং খাগড়াছড়ির সামগ্রিক পর্যটন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র এখন পর্যটকশূন্য। এর ফলে পরিবহন শ্রমিক, হোটেল-রিসোর্টের কর্মচারী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

অন্যদিকে, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় পাহাড়ের কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। উৎপাদিত ফলমূল ও শাকসবজি সময়মতো বাজারজাত করতে না পারায় অনেক কৃষিপণ্য ক্ষেত এবং স্থানীয় বাজারে পড়ে নষ্ট হচ্ছে।

জানা গেছে, ইউপিডিএফ-সমর্থিত সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন একটি আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএসের (সন্তু গ্রুপ) সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, এই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিরোধের কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সাজেকে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিয়েছে এবং খাগড়াছড়ির অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও পর্যটকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকগামী জিপ, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও সহকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আয় করতে পারছেন না। পর্যটক না থাকায় হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ এবং পর্যটনকেন্দ্রের আশপাশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে যারা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন, তারা কাজ হারিয়ে পরিবার নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

খাগড়াছড়ির ভাতঘর হোটেলের কর্মচারী মো. আবদুর রহিম বলেন, “পর্যটক না থাকলে হোটেলে কাজ থাকে না। কয়েক দিন ধরে ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না। আয় বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু সংসারের খরচ তো বন্ধ নেই। হোটেলে বাইরে থেকে পর্যটক না এলে খাব কী, সংসার চালাব কীভাবে! এটা দেখার কেউ নেই।”

খাগড়াছড়ির অবকাশ হোটেলের কর্মচারী মো. জুয়েল জানান, পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন কাজের প্রচণ্ড চাপ থাকলেও বর্তমানে পর্যটক না থাকায় অনেক কর্মচারীকে অলস বসে থাকতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকেরই কাজ হারানোর ভয় রয়েছে। আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন।

খাগড়াছড়ি-সাজেক কাউন্টারের পাশে চায়ের দোকান চালানো মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “পর্যটকদের ওপর নির্ভর করেই আমাদের ব্যবসা। পর্যটক না থাকলে দোকানে বিক্রি হয় না। আজ সকালে এক কেতলি চা বানিয়েছিলাম, এক কাপ চাও বিক্রি করতে পারিনি। দোকানভাড়া আছে। মাস শেষে ভাড়া দিতেই হবে। কিস্তিও আছে। প্রতিদিন দোকান খুলেও কোনো আয় হচ্ছে না। ধারদেনা করে সংসার চালাব কীভাবে, সেই চিন্তায় আছি।”

আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন বলেন, পর্যটন মৌসুমে কিছু আয় করে সারা বছরের খরচের একটি অংশ মেটানোর আশা করেন তারা। কিন্তু সাজেকে টানা অবরোধের কারণে সেই আশাও এখন শেষ হয়ে গেছে। দোকানের পণ্য পড়ে থাকলেও কোনো বিক্রি নেই। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।

সাজেকগামী মাহেন্দ্র গাড়ির চালক মো. ইব্রাহীম বলেন, “পর্যটকদের নিয়ে সাজেকে যাতায়াত করেই আমাদের সংসার চলে। এখন সাজেকে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধের কারণে আমাদের কষ্ট পেতে হচ্ছে। গাড়ি নিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। গাড়ির কিস্তি, জ্বালানি খরচ ও পরিবারের ব্যয় কীভাবে চালাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”

খাগড়াছড়ি-সাজেক রুটের আরেক জিপচালক মো. মুন্না বলেন, পর্যটক কমে যাওয়ায় গাড়ি চালিয়ে আগের মতো আয় হচ্ছে না। অনেক দিন ধরে তারা গাড়ি চালাতে পারছেন না। তাদের মতো শ্রমজীবী মানুষের আয় বন্ধ হলে পরিবার নিয়ে চলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, “সাজেকে আমরা যারা গাড়ি চালাই, প্রত্যেকে গাড়িপ্রতি বিভিন্ন সংগঠনকে চাঁদা দিয়ে টোকেন নিয়ে গাড়ি চালাই। এরপরও আমাদের এত কষ্ট পেতে হচ্ছে।”

খাগড়াছড়ি সিএনজি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জসীম বলেন, সাজেকে অবরোধের কারণে খাগড়াছড়ির পরিবহন খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। সাজেককেন্দ্রিক প্রায় সাড়ে তিন হাজার জিপ ও সিএনজি চলাচল বন্ধ থাকায় চালক-সহকারীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এবং গাড়ির মালিকেরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দ্রুত পরিস্থিতির সমাধান না হলে পরিবহন খাতের ক্ষতি আরও বাড়বে। তার অভিযোগ, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের বিরোধের কারণে টানা অবরোধে সাজেকসহ খাগড়াছড়ির পর্যটনকেন্দ্রগুলো অচল হয়ে পড়েছে।

সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা (জন) বলেন, মেঘের রাজ্য সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেকে আসেন। কিন্তু এবার টানা অবরোধের কারণে সাজেকসহ খাগড়াছড়ির পর্যটনকেন্দ্রগুলো পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। এর মাশুল গুনতে হচ্ছে তাদের।

রাহুল চাকমা আরও বলেন, “পর্যটন মৌসুমে খাগড়াছড়ি ও সাজেকে প্রতিদিন অন্তত দেড় থেকে দুই কোটি টাকার লেনদেন হতো। এর সুফল পেতেন পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত সবাই। কিন্তু টানা অবরোধে পুরো পর্যটনশিল্প স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক বুকিং বাতিল করতে হয়েছে। বিনিয়োগ করা বিপুল পরিমাণ অর্থ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কর্মচারীদের বেতন দিতে না পেরে অনেককে বাধ্য হয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন তারা।” তিনি জানান, কবে নাগাদ অবরোধ শিথিল হবে তার কোনো ইঙ্গিত তিনি পাচ্ছেন না। সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির মূল দাবি জেএসএসের (সন্তু গ্রুপ) সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া কবে পূরণ হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে সাজেকে টানা অবরোধের কারণে পাহাড়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। সাজেক ও আশপাশের এলাকায় উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ফলমূল ও শাকসবজি পরিবহন করতে না পারায় সেগুলো ক্ষেত ও স্থানীয় বাজারে পড়ে নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। এতে একদিকে কৃষকেরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সাজেকে খাদ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিবছর পর্যটন মৌসুম এলেই পাহাড়ের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের তৎপরতা বেড়ে যায়। চাঁদা আদায় ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পাহাড়ে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পাহাড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ও দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা খাগড়াছড়ি ও সাজেক ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অনেকে খাগড়াছড়ি ও সাজেকের পরিবর্তে রাঙামাটির লেককেন্দ্রিক পর্যটন এলাকা কিংবা বান্দরবানের দিকে যাচ্ছেন। এতে খাগড়াছড়ির পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন খাত সচল রাখতে অবরোধের স্থায়ী সমাধান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবহনশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় পাহাড়ের পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হতে পারে।

খাগড়াছড়ি হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মীর হোসেন বলেন, “পর্যটন মৌসুমে খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের আগমনে হোটেল-রিসোর্টগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য থাকে। কিন্তু বর্তমানে পর্যটক না থাকায় অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টে বুকিং কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে হোটেলকর্মীদের ওপরও। পর্যটন খাত সচল রাখতে দ্রুত অবরোধ প্রত্যাহার ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।”