পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে আজ শনিবার ভোর থেকে অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথে অবরোধ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ নামক একটি সংগঠনের আহ্বানে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যা আজ দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।

সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, সাজেকে সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এই অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।

অবরোধের প্রভাবে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। খাগড়াছড়ি থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। তবে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। দুই জেলার বিভিন্ন স্থানে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছেন অবরোধকারীরা। অনেক জায়গায় গাছের গুঁড়ি ও গাছ কেটে ফেলে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটি শহরের বনরূপা ও কল্যাণপুর বাজারসহ অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কেও দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের সাপছড়ি খামারপাড়া ও কুতুকছড়ি ধর্মঘর এলাকায় গাছের গুঁড়ি ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে পিকেটিং করছেন আন্দোলনকারীরা। কুতুকছড়ি হাফ বাজার থেকে ধর্মঘর পর্যন্ত একটি বিক্ষোভ মিছিলও বের করা হয়েছে।

রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে কর্মরত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সেলিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক আছে। সকালে আমাদের অনেক অটোরিকশা ও রাঙামাটি থেকে ছেড়ে যাওয়া পাহাড়িকা বাস চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে।’

রাঙামাটি-চট্টগ্রাম বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সহসাধারণ সম্পাদক মো. ইউছুপও এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, চট্টগ্রাম রুটে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও অবরোধের কারণে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ আছে।

সাপছড়ি এলাকার বাসিন্দা ফিজিরিক্কি চাকমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সকাল থেকে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ আছে। আমি বিশেষ কাজে রাঙামাটি বাজারে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু গাড়ি না পাওয়ার কারণে যেতে পারিনি।’

তবে নৌপথে এই অবরোধের কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির লাইনম্যান বিশ্বজিৎ দে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, রাঙামাটির কাপ্তাই লেকে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক আছে।

অবরোধকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মোখলেছুর রহমান।

অন্যদিকে, খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী ব্রিজ ও স্বনির্ভর এলাকা, খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের কৃষি গবেষণা এলাকা এবং চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের গুইমারা জোড়াব্রিজ এলাকায় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছেন অবরোধকারীরা। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের সাপমারা এলাকায় গাছ কেটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় কিছু অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে। ভোরে ঢাকা থেকে আসা রাতের বাসগুলো পুলিশি পাহারায় খাগড়াছড়িতে পৌঁছেছে।

খাগড়াছড়ি থানার ওসি মো. কায় কিসলু বলেন, ঢাকা থেকে আসা রাতের বাসগুলো পুলিশি পাহারায় খাগড়াছড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। কয়েকটি বাস দেরিতে পৌঁছানোর কারণে রামগড়ে আছে। সেগুলোকে দুপুর ১২টার পর খাগড়াছড়িতে আসতে বলা হয়েছে। শহরের কয়েকটি স্থানে পিকেটাররা টায়ার জ্বালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের ধাওয়া দিয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত আছে।

অবরোধের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে। তবে বেতবুনিয়া এলাকায় পিকেটিং করার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের কর্মীদের বাধা দিয়েছে।’

সাজেকের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সাজেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। সেখানে কোথাও পিকেটিংয়ের খবর পাওয়া যায়নি, তবে কোনো যানবাহনও চলাচল করছে না।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমার সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যান ও সাংবাদিকদের গাড়িকে এই অবরোধের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ মূলত ইউপিডিএফ-সমর্থিত একটি সংগঠন। তবে এই দাবি অস্বীকার করে ইউপিডিএফের এক সদস্য বলেন, সংগঠনটি তাঁদের সমর্থিত নয়।

এর আগে গত বুধবার সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। এটি ওই দুই সংগঠনের তৃতীয় দফা অবরোধ। সংগঠন দুটির অন্যতম দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (সন্তু লারমা সমর্থিত জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া।

তবে জেএসএস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এমন মনগড়া অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’

গত বুধবার সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে পর্যটকদের নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পর্যটকেরা সাজেক ছাড়তে শুরু করেন। তবে ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় তাঁরা অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়েন।

পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের সরিয়ে দিলে পর্যটকদের গাড়িবহর এগিয়ে যায়। এরপর বেলা ১১টার দিকে গোলাগুলি শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছেন। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ।

এই উত্তেজনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার বেলা একটার দিকে সাজেকে আটকে পড়া ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে দেওয়া হয়।