বৃষ্টিভেজা লালগালিচায় শুরু হয়ে বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় শেষ হলো ৩৯তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। ১০ দিনের এই দীর্ঘ চলচ্চিত্রযাত্রার সমাপ্তি ঘটল ৪ নভেম্বর। উৎসব চলাকালীন হিবিয়া, মারুনৌচি, ইউরাকুচো এবং গিনজাসহ বিভিন্ন ভেন্যুতে মোট ২০৪টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। সমাপনী সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে ইউরাকুচোর হিউলিক হলে একত্রিত হয়েছিলেন বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা। সেখানেই একে একে ঘোষণা করা হয় এবারের পুরস্কারসমূহ।
উৎসবের সর্বোচ্চ সম্মান ‘টোকিও গ্রাঁ প্রি—দ্য গভর্নর অব টোকিও অ্যাওয়ার্ড’ জয় করেছে উত্তর মেসিডোনিয়ার নির্মাতা মিলচো মানচেভস্কির চলচ্চিত্র ‘সিস্টার ব্রাদার ম্যানহোল কাভার’। অন্যান্য পুরস্কারগুলোতেও ফুটে উঠেছে বৈচিত্র্যময় গল্প এবং নির্মাণশৈলীর অনন্যতা। কোথাও দেখা গেছে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম, কোথাও ইতিহাস ও কল্পনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন, আবার কোথাও উঠে এসেছে অপূর্ণ স্বপ্নের কথা। সমাপনী অনুষ্ঠানের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও বিচারকদের আলোচনায় উঠে আসে এই চলচ্চিত্রগুলোর নেপথ্যের গল্প।
সর্বোচ্চ পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘সিস্টার ব্রাদার ম্যানহোল কাভার’ ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দরিদ্র দুই ভাই-বোন মালিনা ও ভিক্টর। উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কোপিয়েতে তারা ম্যানহোলের ঢাকনা এবং ব্রোঞ্জের তৈরি আবক্ষ মূর্তি চুরি করে ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করে জীবন অতিবাহিত করে। একদিন এক জাতীয় বীরের ভারী মূর্তি ভিক্টরের পায়ে পড়ে সে গুরুতর আহত হয়। ভাইয়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে গিয়ে মালিনার জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে ওঠে। দুই ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এই ছবিতে সামাজিক অবহেলা, চরম দারিদ্র্য ও সম্পদের বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। উত্তর মেসিডোনিয়া, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, আলবেনিয়া, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবিটিতে হাস্যরস, ট্র্যাজেডি ও নাটকীয়তার যে সমন্বয় ছিল, তা বিচারকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে।
পরিচালক মিলচো মানচেভস্কি জানান, বাড়ির কাছের পার্ক থেকে জাতীয় বীরদের মূর্তি উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা থেকেই তাঁর গল্পের ভাবনাটি আসে। পরবর্তীতে তিনি লক্ষ্য করেন যে, সেসব মূর্তির প্রতিরূপগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, ভাঙারির দোকানে প্রতি কিলোগ্রাম ব্রোঞ্জের দাম মাত্র তিন ইউরো। তখনই তিনি ঘটনাটিকে চোরদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার কথা চিন্তা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে মুক্তকণ্ঠের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, কঠিন বাস্তবতার গল্পে হাস্যরস ও দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলতে অভিনয়শিল্পীরা কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। মালিনা চরিত্রের অভিনেত্রী সারা ক্লিমোস্কা জানান, ফিলিপ ট্রাইকোভিচের সঙ্গে চলচ্চিত্র ও মঞ্চে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। ছবিটির জন্য তিন সপ্তাহ মহড়া করেছেন তাঁরা। বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন কমেডির দৃশ্যগুলোতে। ট্রাইকোভিচ বলেন, “সহশিল্পীর অভিনয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দেওয়াই বিশ্বাসযোগ্য জুটি তৈরির ভিত্তি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও চরিত্রগুলোর আনন্দ ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।” পরিচালকের পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রযোজক ইয়ানে কর্তোশেভ। মঞ্চে রসিকতা করে তিনি বলেন, “আমরা টোকিওতে এসেছিলাম একটি ম্যানহোলের ঢাকনা নিয়ে, আর মেসিডোনিয়ায় ফিরছি এই সুন্দর পুরস্কার নিয়ে। আমার তো মনে হয়, বেশ ভালো বিনিময়ই হলো।”
পুরস্কারের তালিকায় ছিল বৈচিত্র্যময় চলচ্চিত্রভাষা। বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছে সুন শুনের সিঙ্গাপুরি চলচ্চিত্র ‘ম্যাজিক অ্যাটলাস’। উডকাট অ্যানিমেশনের মাধ্যমে বাস্তব ও কল্পনা, ইতিহাস ও পুরাণের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন নির্মাতা। প্রায় এক দশকের কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কারটি এসেছে। ‘ডাবল ফ্রিডম’-এর জন্য সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন লিসান্দ্রো আলোনসো। তাঁর সংযত নির্মাণশৈলী এবং সময়ের প্রবাহকে চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলার দক্ষতার প্রশংসা করেছেন বিচারকেরা। সেরা অভিনেতা নির্বাচিত হয়েছেন ‘টু সিগারেটস, থ্রি নাইটস’-এর নারিতা রিয়ো। তাঁর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন ছবির পরিচালক মিশিমা ইউকিকো। অন্যদিকে ‘দ্য নাইট দ্যাট বাইন্ডস আস’-এ এক মধ্যবয়সী নারীর অসম প্রেমের গল্পে অভিনয় করে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেছেন চীনা অভিনেত্রী হু লিং। সেরা শিল্পগত অবদানের পুরস্কার পেয়েছে ইয়েলেনা ম্যাকসিমোভিচের ‘আনটিল দ্য ডে এন্ডস’-এর চিত্রগ্রহণ। সার্বিয়ার একই সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা, কিন্তু ভিন্ন সুযোগ পাওয়া দুই তরুণ-তরুণীর সম্পর্ক নিয়ে এই ছবিটি। নির্মাতার ভাষায়, প্রতিবাদ এই চলচ্চিত্রের মূল বিষয় নয়, বরং গল্পের প্রেক্ষাপট। দর্শক পুরস্কার পেয়েছে তেওদোরা আনা মিহাইয়ের ‘হেইসেল ৮৫’, যা ফুটবল স্টেডিয়ামের এক হৃদয়বিদারক ঘটনা নিয়ে নির্মিত।
এশিয়ান ফিউচার বিভাগে সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে সুইজারল্যান্ড ও তুরস্কের যৌথ প্রযোজনা ‘শেরিফে তাভসান’। পুরস্কার পেয়ে উচ্ছ্বসিত আফগান পরিচালক তারেক দাউদ বলেন, “জীবনে এই প্রথম কোনো পুরস্কার পেলাম।” সংবাদ সম্মেলনে নির্মাতা জানান, তুর্কি সহলেখকের সঙ্গে ছবিটির গল্প লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তাঁদের দাদি-নানিদের জীবন থেকে। সীমিত সুযোগের মধ্যেও পরিবারের জন্য ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছেন তাঁরা, অথচ নিজেদের অনেক স্বপ্নই অপূর্ণ থেকে গেছে। সেই প্রাপ্তি ও আক্ষেপের অভিজ্ঞতাকে একটি সর্বজনীন গল্পে রূপ দিতে চেয়েছেন নির্মাতারা।
এবার নতুন চালু হওয়া ‘নিপ্পন সিনেমা নাউ’ বিভাগে সেরা চলচ্চিত্র হয়েছে তানাকা মিকির ‘সিলভার এক্সপ্রেস’। জার্মানি ও ইউক্রেনের যৌথ প্রযোজনা ‘আই রেয়ারলি ওয়েক আপ ড্রিমিং’ পেয়েছে টিএফ এথিক্যাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড। কুরোসাওয়া আকিরা পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন ও মিপো ও মোহাম্মদ রাসুলোফ। এবারের টোকিও উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নেয় বাংলাদেশের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ দর্শকদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো পুরস্কার জিততে পারেনি।
সমাপনী অনুষ্ঠানের পর ইউরাকুচো আসাহি স্কয়ারে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরিপ্রধান রলফ ডি হিয়ার। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিচারকমণ্ডলীর অন্য চার সদস্য অ্যালেক্স লো, ও জুংওয়ান, ওয়াতানাবে মাকিকো ও ইয়োভ মুর। রলফ ডি হিয়ার জানান, ভিন্ন ধরনের ১৫টি চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে সেরা কাজগুলো বেছে নেওয়া সহজ ছিল না। তবে আলোচনা করে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, যাতে বিচারকমণ্ডলীর সবাই সন্তুষ্ট। মুক্তকণ্ঠের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, প্রতিযোগিতার চলচ্চিত্রগুলো বিচার করার সময় তাঁরা মূলত কী খুঁজেছেন। জবাবে জুরিপ্রধান বলেন, “একটি চলচ্চিত্র দেখার সময় আমি সাধারণত সেটির মধ্যে ডুবে থাকতে চাই। চলচ্চিত্রটি আমাকে কী দিচ্ছে, সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিচারকের দৃষ্টিতে ছবি দেখা সাধারণ দর্শক হিসেবে দেখার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা।”
আরেক প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়, প্রতিযোগিতার ১৫টি চলচ্চিত্র বিশ্ব চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কী বার্তা দেয়? চলচ্চিত্র কি এগোচ্ছে, নাকি পিছিয়ে পড়ছে? রলফ ডি হিয়ার বলেন, “বিপুলসংখ্যক চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া মাত্র ১৫টি ছবি দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করা কঠিন। তবে এই ছবিগুলোর বৈচিত্র্য স্পষ্ট। নির্মাতারা অর্থবহ চলচ্চিত্র তৈরি করতে চাইছেন। এমন এক সময়ে এটি ঘটছে, যখন অর্থবহ চলচ্চিত্রের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।”
উৎসবের সমাপনী চলচ্চিত্র ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার পরিচালক ইয়ন সাং-হোর ‘কলোনি’। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিচালক ও অভিনেতা কু গিয়ো-ফান। তাঁরা অ্যাকশন, জম্বি চলচ্চিত্র এবং প্রেক্ষাগৃহে ছবি দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন। ১০ দিনের এই উৎসবে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি ছিল মাস্টারক্লাস, বিশেষ সংলাপ, সম্মাননা ও চলচ্চিত্রকর্মীদের মতবিনিময়। জেজে ও ওয়েন ওয়াংয়ের মাস্টারক্লাস, জার্মান নির্মাতা উলরিকে ওটিঙ্গারের সঙ্গে আলোচনা, চলচ্চিত্রকর্মীদের আদান-প্রদানের আয়োজন ‘টোকিও টক’ এবং ক্রসকাট এশিয়া প্লাসের বিশেষ সিম্পোজিয়াম ছিল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া অস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় ‘একাডেমি ইন টোকিও’ শীর্ষক বিশেষ সংলাপ। উৎসব কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এবার চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে দর্শকসংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৭২, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি।
১০ দিনের আয়োজনের সমাপ্তি ঘোষণা করতে মঞ্চে আসেন উৎসব পরিচালক হিসামাৎসু তাকেও। তাঁর কথায়, এবারের উৎসবে এমন অনেক চলচ্চিত্র ছিল, যা দর্শকদের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একই সঙ্গে নানা দেশের নির্মাতা ও দর্শকের মধ্যে তৈরি হয়েছে যোগাযোগের নতুন সুযোগ। আগামী বছর টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৪০তম আসর অনুষ্ঠিত হবে। সেই আয়োজন আরও বৈচিত্র্যময় ও প্রাণবন্ত করার প্রত্যয় জানান উৎসব পরিচালক। বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় শেষ হলো এবারের চলচ্চিত্র উৎসব। পুরস্কার হাতে ফিরলেন বিজয়ীরা, নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলেন নির্মাতা ও দর্শকেরা। আর টোকিও অপেক্ষায় রইল বিশ্ব চলচ্চিত্রের পরবর্তী মিলনমেলার।