জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিন হিসেবে বিয়ের দিনটিকে ঘিরে থাকে অগণিত স্বপ্ন। সাধারণত পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুদের উপস্থিতিতে এই দিনটি আনন্দমুখর হয়ে ওঠে। তবে চীনের এক তরুণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তাঁর মনে ছিল এক গভীর দুশ্চিন্তা—নিজের বিয়েতে অতিথি আসবে তো? শৈশবেই বাবাকে হারিয়েছেন তিনি, পাশে ছিলেন না মা-ও। ফলে আত্মীয়স্বজনের অভাববোধ থেকে বিয়ের আয়োজন নিয়ে মন খারাপ ছিল তাঁর।
অবশেষে এক অনন্য সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষদের নিজের বিয়েতে আমন্ত্রণ জানান। তাঁর প্রত্যাশা ছিল সামান্য, হয়তো ১০ থেকে ২০ জন মানুষ সাড়া দেবেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাঁর কল্পনার সব সীমা ছাড়িয়ে যায়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানাতে সেখানে ভিড় জমান ১০ হাজারের বেশি মানুষ। তারা শুধু উপস্থিতই হননি, বরং সঙ্গে নিয়ে আসেন নানা উপহার ও খাবার। কেউ কেউ বিয়ের রান্নার দায়িত্ব নেওয়া থেকে শুরু করে যাতায়াতের গাড়ির ব্যবস্থাও করে দেন।
ঘটনাটি চীনের ইউনান প্রদেশের ঝাওথং এলাকার। আলোচিত এই তরুণের নাম শু চেংহং, বয়স ২৪ বছর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ‘শিয়াও শিয়াও শু’ নামে পরিচিত। গত ৩১ অক্টোবর ইউনান প্রদেশে প্রেমিকা লুও চুইকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের ঠিক ছয় দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত মানুষদের বিয়েতে আসার অনুরোধ জানিয়েছিলেন শু চেংহং।
শুরু থেকেই জীবন ছিল সংঘাতময় শুর। তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। এর দুই বছর পর মা পুনরায় বিয়ে করায় তিনি ও তাঁর বড় ভাই দাদির কাছে বড় হতে থাকেন। পরবর্তীতে দাদির মৃত্যুতে দুই ভাই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়েন। শৈশবেই পরিবারের সদস্যদের একে একে হারিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় শুকে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নামেন তিনি। কখনো নির্মাণ শ্রমিক, আবার কখনো পণ্য সরবরাহকারী কর্মী হিসেবে জীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি।
বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে বিয়ের জন্য কিছু অর্থ জমিয়েছিলেন শু। কিন্তু বিয়ের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, জীবনের এই চরম আনন্দের দিনে পাশে থাকার মতো খুব বেশি আত্মীয়স্বজন নেই।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শু ভেবেছিলেন তাঁর বিয়েতে হয়তো তিন টেবিলের বেশি অতিথি হবে না। এই একাকীত্ব দূর করতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে অপরিচিতদের আমন্ত্রণ জানান। শুরুতে তাঁর আশা ছিল, ১০ থেকে ২০ জন মানুষ এলেও আয়োজনটি কিছুটা জমে উঠবে। কিন্তু ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর অভাবনীয় সাড়া মেলে।
চীনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন। অনেকে শুধু অতিথি হিসেবেই আসেননি, সঙ্গে এনেছেন বিয়ের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। কেউ চাল, সবজি ও রান্নার উপকরণ নিয়ে আসেন, কেউ উপহার দেন গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিস। এমনকি হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু নিয়ে আসার খবরও পাওয়া গেছে।
বিয়ের রান্নার দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেন কয়েকজন পেশাদার রাঁধুনি, যারা সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে খাবার তৈরির প্রস্তাব দেন। অন্যরা বাড়ি সাজানো, অতিথিদের বসার ব্যবস্থা এবং বিয়ের অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে সাহায্য করেন। নবদম্পতির যাতায়াতের জন্য শুভাকাঙ্ক্ষীরা গাড়ির ব্যবস্থাও করে দেন, যার মধ্যে ছিল বিলাসবহুল মেবাখ গাড়িও।
অতিথিদের সংখ্যা এত বেশি হয়ে যায় যে, নির্ধারিত স্থানে সবাইকে জায়গা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বড় পরিসরে নতুন করে আয়োজনের ব্যবস্থা করতে হয়। স্থানীয় প্রশাসনও এই মানবিক উদ্যোগে এগিয়ে আসে। অতিথিদের যাতায়াত, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং খাবারের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা প্রদান করে তারা।
সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, শেষ পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি মানুষ এই বিয়ের আনন্দে শামিল হন। একটি ছোট পারিবারিক আয়োজন মুহূর্তেই বিশাল উৎসবে পরিণত হয়। শুর বিয়ের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নবদম্পতিকে ঘিরে মানুষের ভিড় এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
এই ঘটনাটি দেখে আবেগাপ্লুত হয়েছেন নেটিজেনরা। অনেকে লিখেছেন, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার এমন দৃশ্যই তাঁরা দেখতে চান। কারও মন্তব্য, অপরিচিত মানুষও কখনো কখনো পরিবারের মতো পাশে দাঁড়াতে পারেন।
যে তরুণ ভেবেছিলেন বিয়ের দিনে অতিথিদের জন্য সাজানো অধিকাংশ চেয়ারই হয়তো খালি থাকবে, তাঁর আনন্দ ভাগ করে নিতে শেষ পর্যন্ত হাজির হলেন হাজারো মানুষ। অপরিচিতদের একটি সাধারণ নিমন্ত্রণ এভাবেই হয়ে উঠল ভালোবাসা আর সহমর্মিতার এক ব্যতিক্রমী গল্প।