জরুরি মুহূর্তে রক্তের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন রোগীর স্বজনরা। একের পর এক জায়গায় যোগাযোগ করা সত্ত্বেও কোনো রক্তদাতা পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন চরম সংকটে মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে এলেন হাসপাতালেরই একজন চিকিৎসক। রোগীর রক্তের গ্রুপের সঙ্গে নিজের গ্রুপের মিল থাকায় তিনি নিজেই রক্তদান করেন।

মানবিক এই উদ্যোগটি নিয়েছেন বরিশালের উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মাহিদুল ইসলাম তুহিন। তার দেওয়া রক্তে ধীরে ধীরে শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠছেন রোগী আঞ্জুরা বেগম (৪০)।

সোমবার (২ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসকের এই রক্তদানের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশংসা পাওয়া যায়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ অক্টোবর ‘ইনকমপ্লিট অ্যাবরশন’ সমস্যা নিয়ে উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন আঞ্জুরা বেগম। তিনি উপজেলার বড়াকোঠা ইউনিয়নের বোহরকাঠি গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামী মঞ্জু হাওলাদার একজন দিনমজুর। ভর্তি হওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, আঞ্জুরা বেগমের শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর পাশাপাশি তার রক্তক্ষরণও চলছিল। শারীরিক অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা দ্রুত রক্ত দেওয়ার পরামর্শ দেন।

রোগীর স্বামী মঞ্জু হাওলাদার জানান, তার স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ। আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন রক্তদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ১ নভেম্বর সকাল পর্যন্ত রক্তের কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। রক্তশূন্যতার কারণে স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। ঠিক সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন চিকিৎসক মাহিদুল ইসলাম তুহিন। নিজের রক্তের সঙ্গে রোগীর রক্তের ক্রস ম্যাচিং মিলে যাওয়ায় তিনি রক্তদান করেন।

সোমবার দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে পুরো ঘটনাটি তুলে ধরেন চিকিৎসক মাহিদুল ইসলাম তুহিন। একই সঙ্গে তিনি উজিরপুরে জরুরি রক্তদাতার তীব্র সংকটের বিষয়টিও সবার সামনে আনেন। তিনি উপজেলায় একটি সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান সংগঠন গড়ে তোলার পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত রক্তদাতা খুঁজে পাওয়ার জন্য একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরির আহ্বান জানান।

স্থানীয় সাংবাদিক শাকিল মাহমুদ বাচ্চু বলেন, “চিকিৎসকের দায়িত্ব শুধু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানবিক দায়িত্ববোধও গুরুত্বপূর্ণ। মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে নিজের রক্ত দিয়ে চিকিৎসক মাহিদুল ইসলাম যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা প্রশংসনীয়। উজিরপুরসহ বরিশালবাসীর কাছে এ উদ্যোগ মানবিকতার একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।”

এ বিষয়ে ডা. মাহিদুল ইসলাম তুহিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নিজের রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ওই রোগীর রক্তের গ্রুপ ও ক্রস ম্যাচিং মিলে যাওয়ায় রক্ত দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে অন্য কোনো গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন হলে দ্রুত তা সংগ্রহ করা যাবে কি না, সে বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “উজিরপুরে জরুরি রক্তের সংকট মোকাবিলায় একটি সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি জরুরি মুহূর্তে দ্রুত রক্তদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরি করতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা উচিত।”