পৃথিবী এক অদ্ভুত ও রহস্যময় জায়গা। মানুষ প্রায়ই যা চায় তা ভুল করে চায়, আর যা পায় তা আর চায় না। মারিয়ার ক্ষেত্রেও তেমনটিই ঘটেছিল। সে চেয়েছিল পরশকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার জীবনে এল নোবেল নামের এক পরশপাথর।

মারিয়া পছন্দ করত পরশকে, আর পরশও তাকে অপছন্দ করত না। তবে বিয়ের আগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার তাড়নায় পরশের পরিকল্পনাগুলো দীর্ঘ হতে থাকে, আর সেই সাথে বাড়তে থাকে মারিয়ার বয়স।

পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে। নোবেল ছিল শুকনা গড়নের একজন যুবক। তবে মারিয়াকে দেখার পর তার মোটা হতে না পারার আক্ষেপ মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। বিরিয়ানি খাওয়ার সময় মারিয়ার যে একাগ্রতা নোবেল লক্ষ্য করল, তাতে সে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেল। নোবেলের ধারণা ছিল, যে মেয়ে চারপাশের এত হইচই উপেক্ষা করে মুরগির রান খুঁজে বের করে চিবোতে পারে, সে সংসারের জটিল সমস্যাগুলোও নিশ্চয়ই অনায়াসে সামলাতে পারবে!

এর মাসখানেক পর নোবেল বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় মারিয়াকে।

মারিয়া তার বান্ধবীদের কাছে অত্যন্ত গর্বের সাথে ঘোষণা করে, ‘তোরা জীবনে কে কী পেলি জানি না, তবে আমি নোবেল পেতে যাচ্ছি!’

‘তোরা জীবনে কে কী পেলি জানি না, তবে আমি নোবেল পেতে যাচ্ছি!’

কথাটি শুনে রিমি প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিল। সে অবাক হয়ে জানতে চায়, ‘কী বলিস! কোন বিষয়ে?’

মারিয়া তার টোল পড়া গাল গোল করে রহস্যময় ভঙ্গিতে বলে, ‘সময় হলেই দেখতে পাবি।’

রিমির স্বভাবই হলো কথা গোপন রাখতে না পারা। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বান্ধবীমহলে খবরটি রটে গেল। বান্ধবীরা তখন থেকে সংবর্ধনার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। তবে কোন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার পেতে যাচ্ছে, সেই রহস্যটি অন্ধকারেই রয়ে গেল।

অবশেষে বিয়ের দিন সেই রহস্যের অবসান ঘটল। বান্ধবীরা অবাক হয়ে দেখল, শেরওয়ানি পরে বসে আছে নোবেল নামের এক যুবক, আর তার পাশেই বসে আছে মারিয়া!

এতদিন তারা যেটিকে একটি আন্তর্জাতিক অর্জন বলে ভেবেছিল, শেষ পর্যন্ত দেখা গেল সেটি ছিল আন্তর্জাতিক মানের এক বিশাল ভুল!

রিমি হতাশ হয়ে বলে, ‘এই তোর নোবেল?’

মারিয়া নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দেয়, ‘কেন, নকল মনে হচ্ছে?’

রিমি বলে, ‘ভাবছিলাম সুইডেন থেকে আসবে!’

মারিয়া পাল্টা জবাব দেয়, ‘বাংলাদেশে নোবেল থাকতে সুইডেন পর্যন্ত যাব কেন?’

বিয়ের পর মারিয়া ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস লিখল, ‘কোনো গবেষণা ছাড়াই নোবেল পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ!’

পোস্টটি দেখে অভিনন্দন জানানোর হিড়িক পড়ে যায় সবার মধ্যে।

‘কোনো গবেষণা ছাড়াই নোবেল পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ!’

একজন কৌতূহলী ব্যক্তি জানতে চাইলেন, এই পুরস্কারের অর্থমূল্য কত?

মারিয়া উত্তর লিখল, ‘মাস শেষে যা আসবে, সবই আমার।’

এর প্রতিক্রিয়ায় নোবেল মন্তব্য করল, ‘পুরস্কার আমিই, অথচ নিজের টাকাটাও এখন থেকে অন্যের!’

বিয়ের পর নোবেলের জীবন আর পুরস্কারসুলভ রইল না। বাজারের ব্যাগ টানা, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা এবং রান্নার প্রশংসা করা—সবই এখন তার নিয়মিত দায়িত্ব। বিশেষ করে রান্নার প্রশংসা করার কাজটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশংসা কম হলে বিপদ, আর বেশি হলে মনে হয় সন্দেহজনক।

একদিন বাজার থেকে ধনেপাতা আনতে ভুলে গেল নোবেল। এতে মারিয়া রেগে গিয়ে বলল, ‘তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না!’

নোবেল বিস্ময়ের সাথে জানতে চাইল, ‘তাহলে আমাকে পেয়ে এত গর্ব করো কেন?’

মারিয়া চটপট জবাব দিল, ‘নোবেল পাওয়া কি কম গর্বের!’

নোবেল আক্ষেপ করে বলে, ‘তা নয়। কিন্তু অন্যরা নোবেল পেলে শোকেসে রাখে। তুমি নোবেলকে বাজারে পাঠাও—এ কেমন বৈষম্য!’

মারিয়া হেসে উত্তর দেয়, ‘অন্য নোবেলগুলো তো শুধু সাজিয়ে রাখা যায়। তোমাকে দিয়ে অন্তত বাজারটা করানো যায়!’

নোবেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে বুঝতে পারল, পৃথিবীতে নোবেল দুই প্রকার। এক নোবেল পেলে মানুষের ভাগ্য বদলায়, আরেক নোবেল পেলে নোবেলের নিজের ভাগ্যই বদলে যায়!

‘পৃথিবীতে নোবেল দুই প্রকার। এক নোবেল পেলে মানুষের ভাগ্য বদলায়, আরেক নোবেল পেলে নোবেলের নিজের ভাগ্যই বদলে যায়!’