যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসের হিসেবে কোনো একক ব্যক্তির দেওয়া সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অনুদান এটি। তবে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে মাস্কের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পরপরই আর্থিক বাজারে এর প্রভাব দেখা যায়। বুধবার টেসলার শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পায়। এর ফলে মাস্কের মোট সম্পদ কমেছে ৩ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার। ফোর্বসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ৭২০ কোটি ডলার।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ইলন মাস্কের রাজনৈতিক তৎপরতায় লক্ষণীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রাজনৈতিক পোস্ট করার প্রবণতা কমিয়ে তিনি এখন তাঁর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআই-এর চ্যাটবট ‘গ্রক’-এর প্রচারে অধিক মনোযোগ দিচ্ছেন। এছাড়া, ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ এবং রিপাবলিকানদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দেওয়া দুটি পোস্ট মুছে ফেলেছেন মাস্ক।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে যেসব অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তার মধ্যে টেক্সাস অন্যতম। সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো। বিবিসির প্রচার তহবিলসংক্রান্ত তথ্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুধুমাত্র প্যাক্সটনের পক্ষে অন্তত ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয় করেছিলেন ইলন মাস্ক।

টেক্সাস ছাড়াও অ্যারিজোনা, মিশিগান, উইসকনসিন এবং মিনেসোটাসহ আরও বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান প্রার্থীদের পেছনে লাখ লাখ ডলার খরচ করেছেন তিনি। নির্বাচনের একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর এই অর্থ ব্যয় অব্যাহত ছিল। তবে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর এক্সে কিছুটা রসিকতার সুরে মাস্ক লেখেন, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে যে ‘মহাকাশের লেজার’ ব্যবহার করেছিলেন, তা কাজ করেনি।

রিপাবলিকানদের জন্য এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পর তাদের পরাজয় মাস্কের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে সরকারি চুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের অবকাঠামো নির্মাণে তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর যে সম্পৃক্ততা রয়েছে, তা নতুন রাজনৈতিক জটিলতার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মাস্কের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স আনুমানিক ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলারের নতুন সরকারি চুক্তি লাভ করেছে। তবে সরকারি ও জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে স্পেসএক্সের এই ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন একাধিক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা।

এর পাশাপাশি স্পেসএক্সের বিশাল তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও এখন বাধার মুখে পড়তে পারে। একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে অন্যান্য প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের এআই তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগগুলোও।

জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে স্পেসএক্সের একটি তথ্যকেন্দ্র রয়েছে। ওই অঙ্গরাজ্যের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর তাঁর নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, এই তথ্যকেন্দ্রের সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সাধারণত এ ধরনের প্রকল্পে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ করছাড় পেয়ে থাকে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ওই গভর্নর।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ ও সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণের পক্ষে জনসমর্থন রয়েছে। এআই সেবা পরিচালনায় ব্যবহৃত এই বিশাল স্থাপনাগুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখন আরও তীব্র হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বিশ্লেষক জেমস ফ্লিনটফ মনে করেন, রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে মাস্কের এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তাঁর মতে, এই খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট সিনেটর এড মার্কি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো হতে পারে।