সুনামগঞ্জের হাওরবেষ্টিত ধর্মপাশা এবং পার্শ্ববর্তী মধ্যনগর উপজেলার তিন লাখেরও বেশি মানুষের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, কোটি কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং উন্নত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র অভাবে সাধারণ মানুষ যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বর্তমানে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে এবং আলট্রাসনোগ্রাম সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া দক্ষ সার্জন ও অ্যানেসথেটিস্টের অনুপস্থিতির কারণে আধুনিক অপারেশন থিয়েটারটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এবং ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রান্তিক এলাকার একটি সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে এমন চরম অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার চিত্র কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মুক্তকণ্ঠের এক প্রতিবেদনে এই হাসপাতালের দীর্ঘমেয়াদী সংকটের বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সেই অনুপাতে জনবল নিয়োগ দিয়ে সেবার পরিধি বাড়ানো হয়নি। হাসপাতালের চিকিৎসকের জন্য নির্ধারিত ৩৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ২৫টি পদ বছরের পর বছর ধরে শূন্য পড়ে আছে। বিশেষ করে গাইনি, সার্জারি, মেডিসিন এবং অ্যানেসথেসিয়ার মতো অত্যন্ত জরুরি বিষয়গুলোতে কোনো জুনিয়র কনসালট্যান্ট নেই। প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ জন প্রসূতি, শিশু এবং সাধারণ রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও মাত্র ১১ জন চিকিৎসক নিয়ে পুরো চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্টের অভাব এবং এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষ তালাবদ্ধ থাকায় রোগীরা বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে চড়া মূল্যে এসব পরীক্ষা করাচ্ছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রসূতিসেবার ক্ষেত্রে। প্রতি মাসে গড়ে ৬০ জন প্রসূতি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনে এই হাসপাতালে আসলেও সার্জনের অভাবে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অসহায় রোগীরা নেত্রকোনা কিংবা মোহনগঞ্জের হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে যাতায়াত এবং অস্ত্রোপচারের জন্য পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত ২৫-৩৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। হাওরাঞ্চলের দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলোর জন্য এই বাড়তি খরচ অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং এক ধরণের আর্থিক পেষণ। পাশাপাশি হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড না থাকায় তাঁদের বারান্দায় কিংবা মেঝের ওপর শুয়ে কাটাতে হচ্ছে।

প্রশ্ন জাগে, আমাদের নীতিনির্ধারকেরা কেন বুঝতে চান না যে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনে ফেলে রাখলেই স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হয় না; বরং সেই যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বারবার লিখিতভাবে এই সংকটের কথা জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে কার্যকর করতে না পারলে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার কোনোদিন সম্ভব হবে না। তাই আমরা জোরালো দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শূন্য পদগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ দেওয়া হোক। পাশাপাশি অকেজো যন্ত্রপাতি দ্রুত মেরামত ও সচল করে হাওরাঞ্চলের তিন লাখ মানুষের মৌলিক চিকিৎসা অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।