চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকটে প্রায় আড়াই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে প্রসূতিসহ সব ধরনের বড় অস্ত্রোপচার। সরকারি হাসপাতালে এই জরুরি সেবাগুলো না পাওয়ায় সাধারণ মানুষকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ছুটতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে শুধু অস্ত্রোপচারই নয়, প্রায় এক বছর আট মাস ধরে বন্ধ রয়েছে এক্স-রে সেবা। এছাড়া গত এক মাস ধরে আলট্রাসনোগ্রাফি সেবাও বন্ধ হয়ে আছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের দাবি, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শূন্য পদে লোক নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে, তবে কোনো নিয়োগ না হওয়ায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রাজন কুমার দাস জানান, হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে বহির্বিভাগে ৪০০ থেকে ৫০০ জন রোগী চিকিৎসা নেন এবং প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী ভর্তি থাকেন।

হাসপাতাল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের মোট পদ আছে ৩৫টি, যার মধ্যে ১৬টি পদই শূন্য। এছাড়া আরও দুজন চিকিৎসক প্রেষণে অন্য হাসপাতালে কর্মরত আছেন। ফলে বর্তমানে মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক আছেন মাত্র ১৭ জন।

বিশেষ করে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (প্রসূতি) পদটি প্রায় আড়াই বছর ধরে শূন্য। এই পদে কর্মরত তাসলিমা আফরোজ ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল প্রেষণে ঢাকার একটি হাসপাতালে বদলি হয়ে যান। একইভাবে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) পদটিও প্রায় আড়াই বছর ধরে খালি। সর্বশেষ এই পদে কর্মরত মো. ইফতেখার শামীম ২০২৪ সালের ১৯ মে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। পাশাপাশি জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) পদটি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে শূন্য পড়ে আছে। এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে চিকিৎসকের অভাবের কারণেই প্রায় আড়াই বছর ধরে প্রসূতিসহ সব ধরনের বড় অস্ত্রোপচার বন্ধ হয়ে আছে।

গতকাল সোমবার সকালে উপজেলার ভূইয়াকান্দি গ্রাম থেকে জ্বর নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন এক গৃহবধূ। তিনি জানান, এক মাস আগেও তিনি প্রসূতি অস্ত্রোপচারের জন্য এখানে এসেছিলেন, কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই নারী মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, ‘পরে ১৫ হাজার টেয়া খরচা কইরা বেসরকারি হাসপাতালে অপারেশনে বাচ্চা অইছে আমার। ভোগান্তিও অনেক অইছে। সরকারি হাসপাতাল থাইকাও প্রাইভেট ক্লিনিকে যাইতে অয়। এমন হাসপাতাল না থাকলেই কী?’

গতকাল সকাল ১০টার দিকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, অস্ত্রোপচার, এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি কক্ষগুলো তালাবদ্ধ। বহির্বিভাগে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। কর্মরত চিকিৎসকেরা এই বিপুল সংখ্যক রোগীকে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রত্যাশিত সেবা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক রোগী। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুজন কর্মচারী জানান, প্রায় প্রতিদিনই প্রসূতিরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের জন্য এসে ফিরে যান। চিকিৎসকের অভাবে মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন প্রসূতি সরকারি খরচে অস্ত্রোপচারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সেবা সংকটের তালিকায় রয়েছে রোগ নির্ণয় কেন্দ্রও। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) পদটি প্রায় এক বছর আট মাস ধরে শূন্য। সর্বশেষ এই পদে কর্মরত ব্যক্তি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বদলি হন, যার পর থেকে এক্স-রে সেবা বন্ধ। অন্যদিকে, প্রায় এক মাস ধরে আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন নষ্ট থাকায় এই সেবাটিও বন্ধ রয়েছে।

উপজেলার ফতেপুর গ্রামের অদুদ মিয়া গতকাল সকালে হাতের এক্স-রে করাতে এসে হাসপাতাল থেকে ফিরে যাচ্ছিলেন। তিনি প্র থম আলো কে বলেন, অপারেটর না থাকায় এক্স-রে করাতে পারেননি। বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে এক্স-রে করাতে হবে, যার ফলে তাঁর বাড়তি টাকা খরচ হবে।

দীর্ঘদিন ধরে এসব সেবা বন্ধ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রাজন কুমার দাস। গতকাল বেলা ১১টার দিকে তিনি মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের সংকটে সেবা ও চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শূন্য পদে লোক নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়েছেন; কিন্তু লোক নিয়োগ হচ্ছে না।”