কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তীব্র চিকিৎসক সংকটের কারণে গত চার মাসের বেশি সময় ধরে প্রসূতি অস্ত্রোপচার সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে আছে উপজেলার ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টার এবং দীর্ঘ ছয় বছর ধরে চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে আছে একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে, যার ভবনটি বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী।
দাউদকান্দিতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, দোনারচর ২০ শয্যার হাসপাতাল, শহীদনগর ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টার, ছয়টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ১০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিকিৎসকের মোট পদ রয়েছে ৬০টি। তবে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩০ জন। এর মধ্যে ১৫টি পদ শূন্য রয়েছে, ১২ জন চিকিৎসক সংযুক্তিতে অন্য জায়গায় কর্মরত এবং তিনজন চিকিৎসক দীর্ঘ সময় ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত।
রোগীর চাপ ও চিকিৎসকের অভাব
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৩৫টি চিকিৎসকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি সাধারণ চিকিৎসক, ১২টি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ২টি ডেন্টাল সার্জন এবং একটি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পদ। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ছয়টি পদ, জরুরি বিভাগের একটি, সহকারী সার্জনের একটি এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এছাড়া পাঁচজন চিকিৎসক সংযুক্তিতে অন্যত্র কর্মরত।
চিকিৎসকের এই অভাবের প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। কালাসোনা গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম এবং তালেরছেও গ্রামের কৃষক আশরাফ হোসেন গত তিন মাসে ত্বকের সমস্যার জন্য একাধিকবার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলেও কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাননি। গত ২২ সেপ্টেম্বর তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁদের নেই।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. রিয়াদ মাহমুদ মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “এখানে বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ জন, জরুরি বিভাগে ১৫০ থেকে ২০০ এবং অন্তর্বিভাগে ৬০ থেকে ৮০ জন রোগী চিকিৎসা নেন। চিকিৎসক ও নার্স–সংকটের কারণে প্রতিদিনই বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।”
চার মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ প্রসূতি অস্ত্রোপচার
প্রসূতি চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে চার মাসেরও বেশি সময় ধরে দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজার বা প্রসূতি অস্ত্রোপচার বন্ধ। ফলে জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বেসরকারি ক্লিনিক অথবা ঢাকা ও কুমিল্লায় যেতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (প্রসূতি) সুস্মিতা সাহা গত ১৪ জুন বদলির আদেশ পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে যান। এরপর থেকে এই পদটি শূন্য। এছাড়া অবেদনবিদ চিকিৎসক মো. অলি উল্লাহ ২০২১ সালে যোগদানের পর ২০২২ সালে বদলি হয়ে চলে যান, তাঁর পদটিও শূন্য রয়েছে।
চশই গ্রামের গৃহবধূ তাকিয়া আক্তার জানান, গত মাসে অস্ত্রোপচারের জন্য তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ না থাকায় সেবা পাননি। শেষ পর্যন্ত ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে অস্ত্রোপচার করাতে হয়। একইভাবে নলচর গ্রামের ৩০ বছর বয়সী গৃহবধূ মোমেনা আক্তার ১ অক্টোবর বিকেলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেও প্রসূতি চিকিৎসক না থাকায় আঙ্গাউড়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে হয়, যাতে তাঁর ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
পরিত্যক্ত ভবন ও বন্ধ চিকিৎসাসেবা
১৯৬১ সালে নির্মিত দাউদকান্দির স্বপাড়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবনটি ২০০৪ সালেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। স্থানীয়দের মতে, ২০২০ সালের ২৯ মে ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে চিকিৎসা সহকারী দিদার হোসেন ও কয়েকজন রোগীর ওপর পড়ে। এরপর থেকে সেখানে চিকিৎসাসেবা বন্ধ।
স্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মুন্সী ও জিন্নত আলী জানান, স্থানীয়দের দান করা ৭৭ শতাংশ জমিতে এই কেন্দ্রটি তৈরি করা হয়েছিল। দুবার মেরামত করা হলেও ভবনটি এখন আর ব্যবহারের উপযোগী নয়। অনেক রোগী ভবনটি তালাবদ্ধ দেখে ফিরে যান। সরেজমিনে দেখা যায়, পাঁচটি কক্ষ ও বারান্দার ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে, রড বেরিয়ে এসেছে এবং দরজা-জানালা নেই। স্থানীয়দের দাবি, নতুন ভবন নির্মাণ করে এই কেন্দ্রটি চালু করা হোক, কারণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় তাঁদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
অন্যদিকে, গৌরীপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে পাশের আকবর আলী খান কারিগরি কলেজের একটি কক্ষে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ওই কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা (সাকমো) আবু ইউসুফ বলেন, “পুরোনো ভবনটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টি হলে সেখানে পানি জমে যায়। নিরুপায় হয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পাশের কারিগরি কলেজের একটি কক্ষে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।”
অচল শহীদনগর ট্রমা সেন্টার
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসার জন্য শহীদনগরে ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়। তিনতলা ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও আসবাব কেনা হয়েছিল। ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ২০১০ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক এটি উদ্বোধন করেন।
তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও এখানে পরিকল্পিত জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। চিকিৎসক নিয়োগ করা হলেও তাঁরা বদলি হয়ে চলে যান। বর্তমানে সেখানে একমাত্র আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা নাজমুল আলম মূলত সাধারণ জ্বর, সর্দি ও কাশির রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। ট্রমা সেন্টারের নার্সদেরও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করতে হচ্ছে। দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের এখানে আসলে তাঁদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সংযুক্তিতে অন্যত্র ও শূন্য পদের জটিলতা
দোনারচর ২০ শয্যার হাসপাতালের ছয়টি চিকিৎসক পদের মধ্যে দুটি শূন্য এবং বাকি চারজনই সংযুক্তিতে অন্যত্র কর্মরত। তাঁদের মধ্যে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (প্রসূতি) আফরোজা আক্তার শিল্পী ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) তাসনুভা তানজিল ২০২৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে, আরএমও ফরিদা ইয়াসমিন ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে এবং মেডিক্যাল কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন ২০২৬ সালের ২৪ জুন থেকে অন্য হাসপাতালে সংযুক্তিতে আছেন।
এছাড়া বারপাড়া কেন্দ্রের সহকারী সার্জন ফারজানা মালেক ববি ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর থেকে, দাউদকান্দি উত্তর কেন্দ্রের সহকারী সার্জন আয়েশা আফরোজ ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে এবং সুন্দলপুর কেন্দ্রের সহকারী সার্জন সেঁজুতি দে ২০২৬ সালের ২১ জুন থেকে সংযুক্তিতে অন্য হাসপাতালে কর্মরত।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, প্রসূতি ও অবেদনবিদসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একাধিক পদ শূন্য রয়েছে এবং তিনি প্রতি মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়োগের জন্য চিঠি পাঠাচ্ছেন।
কুমিল্লার সিভিল সার্জন মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত চিকিৎসক ও নার্সদের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যোগাযোগ করা হয়েছে। ২৮ অক্টোবর ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করে বিষয়গুলো তুলে ধরবেন তাঁরা। দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।”