যশোর জেলায় প্রায় দুই বছর ধরে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর মারাত্মক ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিনামূল্যে বিতরণের কথা থাকলেও পিল ও কনডমের অপ্রতুলতায় সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন জেলার নিম্ন আয়ের মানুষ। প্রয়োজনের সময়ে পরিবার কল্যাণকেন্দ্র থেকে এসব প্রয়োজনীয় সামগ্রী না পাওয়ায় অনেককে বাধ্য হয়ে বাজার থেকে তা কিনতে হচ্ছে, যা দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামগ্রীর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলেরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তবে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী নভেম্বর মাস থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন জটিলতার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থাতেও সংকট তৈরি হয়। এরপর প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেলেও সরকারি সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাস পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর এই ঘাটতি রয়ে গেছে।

সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনামূল্যে পিল ও কনডম পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারগুলোতেই এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ না পাওয়া গেলে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

যশোর সদর উপজেলার বিরামপুর এলাকার বাসিন্দা রোজিনা খাতুন বলেন, “পরিবার পরিকল্পনা আপাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিতে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। বাজার থেকে কিনতে গেলে বাড়তি টাকা লাগে। সংসারের খরচ চালাতে যেখানে কষ্ট হয়, সেখানে নিয়মিত এসব সামগ্রী কেনা কঠিন।”

শহরের ধর্মতলা রেললাইনের পাশে বসতিতে বসবাসকারী পারভিনা বেগম জানান, আগে পরিবার কল্যাণকেন্দ্র থেকেই প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পাওয়া যেত। কিন্তু এখন সেখানে গেলে সরবরাহ নেই বলে জানানো হয়।

একই সময়ে কথা হয় আফসানার সঙ্গে। তিনি বলেন, “সরকারিভাবে বিনামূল্যে পিল না পাওয়ায় এখন হাসপাতালে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পিল কিনে খেতে হচ্ছে। একপাতা পিল কিনতে ৪০০ টাকা লাগে। আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এই টাকা জোগাড় করা খুবই কঠিন। একপাতা পিল কিনতেই প্রায় দুই দিনের উপার্জনের টাকা চলে যায়।”

পরিবার পরিকল্পনা সমিতি বাংলাদেশের (এফপিএবি) যশোর শাখার ইনচার্জ আজিজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আগে জেলা অফিস থেকে নিয়মিত পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী নিয়ে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা হতো। এখন দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সরবরাহ না থাকায় সেই কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সেবা নিতে আসা অনেক মানুষকে প্রয়োজনীয় পিল ও কনডম দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণও বাড়তে পারে।”

এদিকে শুধু সামগ্রীর সংকটই নয়, জনবল সংকটেও ধুঁকছে যশোরের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার অনুমোদিত ১০৬টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৫০ জন। ফলে এই পদে শূন্য রয়েছে ৫৬টি।

অন্যদিকে পরিবার কল্যাণ সহকারীর অনুমোদিত পদ রয়েছে ৪৯৪টি। এর বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৬৫ জন। অর্থাৎ এ পদে শূন্য রয়েছে ৩২৯টি। দুই পদ মিলিয়ে মোট ৬০০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২১৫ জন এবং শূন্য রয়েছে ৩৮৫টি পদ।

ফলে একদিকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর অনিয়মিত সরবরাহ এবং অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় কর্মীর ঘাটতি—এই দ্বিমুখী সংকটে পরিবার পরিকল্পনা সেবা মারাত্মক চাপে পড়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর কাছে নিয়মিত সেবা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

যশোর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক দিলদার হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সরকারি পর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে পরিবার পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায়নি। ফলে মাঠপর্যায়ের সেবা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে বাজারে কনডম ও পিলের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার সেগুলো কিনতেও পারছে না। এতে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ছে।”

তিনি আরও বলেন, “সরবরাহ সংকট কাটাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, নভেম্বর থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। পাশাপাশি জনবল সংকট মোকাবিলায় নতুন নিয়োগের বিষয়েও অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা চলছে।”