পিরোজপুরের ৪৮টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের অধিকাংশটিতেই দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এর পাশাপাশি চরম জনবলসংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ চিকিৎসাসেবা। বর্তমানে ৪৯টি উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা ও চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। ফলে চিকিৎসা নিতে আসা দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলার মোট ৪৮টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে ২৭টিতে গত সাত মাস ধরে ওষুধের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। বাকি ২১টি কেন্দ্রে সীমিত পরিসরে সেবা চালু থাকলেও গত তিন মাস ধরে সেখানেও ওষুধের কোনো মজুত নেই। এই পরিস্থিতির কারণে কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগীকে কোনো ওষুধ ছাড়াই ফিরে যেতে হচ্ছে।

জেলার সাতটি উপজেলার ৫৪টি ইউনিয়নে মোট ৪৩টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং পাঁচটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবলসংকট প্রকট। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং অবকাঠামোগত নানা সমস্যা সেবার মানকে আরও কমিয়ে দিচ্ছে।

প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ না পাওয়ায় অনেক মানুষ জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ চিকিৎসার জন্য তাদের পকেটের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

পিরোজপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আল আমিন খান বলেন, “মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে গেলে মানুষ ওষুধ পান না। পরীক্ষা-নিরীক্ষাও বাইরে থেকে করাতে হয়। কোনো রোগী গেলে কর্তৃপক্ষ দ্রুত অন্যত্র পাঠানোর চেষ্টা করে। কেন্দ্রটির ভবনও অনেক পুরোনো। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ভালো নয়, শৌচাগারের অবস্থাও খারাপ। চারপাশে ময়লার ভাগাড় ও জঙ্গলসদৃশ পরিবেশ থাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপও বেশি বলে তার অভিযোগ। আগে এখানে যে ধরনের চিকিৎসাসেবা পাওয়া যেত, এখন আর সেই অবস্থা নেই।”

জিয়ানগর উপজেলার চরনিপত্তাশী গ্রামের গর্ভবতী নারী শারমিন আক্তার জানান, পত্তাশী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনেক সময় কাউকে পাওয়া যায় না। অনেক কষ্ট করে এসেও সেদিন চিকিৎসককে পাননি তিনি। দীর্ঘদিন ধরে ওষুধও পাচ্ছেন না। তার দাবি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত সমস্যার সমাধান করে, যাতে তাদের আর ভোগান্তিতে পড়তে না হয়।

একই উপজেলার কালাইয়া গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগম চিকিৎসা নিতে এসে জানান, তার মাথা, নাক-মুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে চর্মরোগ ও ঘা হয়েছে। অনেক দিন ধরে ওষুধ না পেয়ে কেন্দ্র থেকে ফিরে যেতে হচ্ছে। অর্থের অভাবে বাইরে থেকে ওষুধ কেনাও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। এভাবে ওষুধ বন্ধ করে রাখলে কীভাবে বাঁচব? আমাদের দাবি একটাই, সরকার যেন দ্রুত ওষুধ দেয়।”

৪৯ পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১২ জন

ভান্ডারিয়া উপজেলা উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা জাকিয়া পারভিন জানান, এ উপজেলায় ছয়টি ইউনিয়নে ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। ছয়টি পদের বিপরীতে তিনি একাই দায়িত্ব পালন করছেন। ইকরি ও তেলিখালী—এই দুটি কেন্দ্রের তিনটি পদের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে তাকে। অন্য কেন্দ্রগুলোতে পরিদর্শিকারা দায়িত্ব পালন করছেন।

জাকিয়া পারভিন বলেন, “প্রায় সাত মাস ধরে কেন্দ্রে কোনো ওষুধ নেই। পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রীও পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে সাধারণ রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টি হলে কেন্দ্রের ভবন পানিতে ডুবে থাকে। আবাসিক কোয়ার্টারও জরাজীর্ণ। সেখানে হাঁটুসমান পানি জমে থাকে। অফিসের দরজা-জানালাও ভেঙে গেছে।”

জিয়ানগর উপজেলা উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা প্রিয়াঙ্কা বিশ্বাস জানান, এ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে তিনটি পদ থাকলেও তিনি একাই দায়িত্ব পালন করছেন। অন্য দুটি কেন্দ্রের অতিরিক্ত দায়িত্বও তাকে সামলাতে হয়। একজন পরিদর্শিকা রয়েছেন, তাকেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

প্রিয়াঙ্কা বিশ্বাস বলেন, “গত তিন মাস ধরে কেন্দ্রগুলোতে ওষুধ নেই। ফলে দরিদ্র রোগীরা সেবা নিতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে রোগীর সংখ্যা দিন দিন কমছে।” তিনি দ্রুত ওষুধ ও জনবলসংকট নিরসনের দাবি জানান।

পিরোজপুর সদর উপজেলা উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা কৃষ্ণ সূত্রধর জানান, তাদের উপজেলায় আটটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে সাতজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও তিনি ও আরেকজন মিলে দায়িত্ব পালন করছেন। জনবল কম থাকায় রোগীদের সেবা দিতে তাদের কষ্ট হচ্ছে, তবে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

কৃষ্ণ সূত্রধর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ না থাকায় রোগীরা কেন্দ্রে এসে ফিরে যাচ্ছেন। তাদের কেন্দ্রে ২৫ ধরনের ওষুধের সরবরাহ প্রায় তিন মাস ধরে শূন্য। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওষুধ পেতে আরও প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে।

পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সোহাগ হোসেন বলেন, মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণির বেশ কিছু পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদ পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে ওষুধ সরবরাহ না থাকায় রোগীদের মধ্যে তা বিতরণ করা যাচ্ছে না। তবে শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছেন তিনি।

পিরোজপুর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক তুহিন কান্তি ঘোষ জানান, বর্তমানে গর্ভনিরোধক সামগ্রীর কিছুটা সংকট রয়েছে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করা ওষুধেরও কয়েক মাস ধরে ঘাটতি চলছে। নভেম্বরে ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন। তখন মানুষের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়া যাবে।

জনবলসংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, “বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হলে এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এসব সমস্যারও দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।”