পেশায় রাজমিস্ত্রি শাওন শেখ। ৩৫ বছর বয়সী এই যুবক তাঁর স্ত্রীর সন্তান প্রসবের জন্য পিরোজপুর সদরের মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। এসে জানতে পারেন, এখানে অস্ত্রোপচারের (সিজার) ব্যবস্থা নেই। শেষ পর্যন্ত ১ অক্টোবর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে তাঁর স্ত্রীর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ছেলে সন্তান প্রসব হয়।

এ বিষয়ে গত বুধবার পিরোজপুর শহরের পালপাড়ায় কথা হয় শাওন শেখের সঙ্গে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ওই মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রটিতে অস্ত্রোপচার হলে বিনা মূল্যে করাতে পারতেন। কিন্তু বেসরকারি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করাতে তাঁর প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।”

শুধু শাওন শেখ নন, সন্তান প্রসবের জন্য অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা না থাকায় গত এক মাসে আরও ১৫ জন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।

মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রটি ২০ শয্যার। বহির্বিভাগে নিয়মিত রোগী দেখা হয়। তবে এখানে প্রায় ছয় বছর ধরে সন্তান প্রসবের জন্য অস্ত্রোপচার সেবা বন্ধ রয়েছে। ওই কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে অস্ত্রোপচার বন্ধ। তবে এখানে সন্তান প্রসবের জন্য অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ভর্তি রেখে স্বাভাবিক প্রসব করার ব্যবস্থা আছে। স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব না হলে রোগীকে অন্য স্থানে নিতে হয়। গত জুলাই মাসে এখানে ১২ জন, আগস্টে ২০ জন ও সেপ্টেম্বরে ১৩ জন নারীর স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। সেই সঙ্গে গত জুলাই মাসে এখানে বহির্বিভাগ সেবা নেন ১৮০ জন, আগস্টে ৩২৭ ও সেপ্টেম্বরে ১৮৯ জন। ছয় বছর আগে অস্ত্রোপচার সেবা বন্ধ হওয়ার আগে প্রতি মাসে গড়ে ৩০টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে মাসে গড়ে ৫০টি।

কেন্দ্রটির পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা মাহমুদা আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কয়েক দিন আগে এক নারীর স্বাভাবিক প্রসবের জন্য কেন্দ্রে এসেছিলেন। প্রসবের ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর স্বজনেরা জানান, তাঁরা এখানে আর প্রসব করাবেন না, অন্য কোথাও নিয়ে যাবেন। পরে তাঁরা ওই নারীকে নিয়ে চলে যান। কারণ, এখানে অস্ত্রোপচারের চিকিৎসক না থাকায় অস্ত্রোপচার হয় না। তাই ঝুঁকি এড়াতেই কোনো কোনো সময় রোগী নিয়ে চলে যান স্বজনেরা।”

গত বুধবার সকাল ১০টার দিকে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে ২০ শয্যার কোনোটিতে রোগী ভর্তি থাকতে দেখা যায়নি। বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসককে বসে থাকতে দেখা যায়। তবে কোনো রোগী ছিলেন না। কেন্দ্রের বিভিন্ন কক্ষ ও প্রাঙ্গণ ছিল অনেকটাই ফাঁকা। পরে দিন শেষে রেজিস্ট্রার খাতার তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন ১৫ জন রোগী বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছেন।

চিকিৎসকসংকট

সন্তান প্রসবে অস্ত্রোপচার সফল করতে একজন শল্যচিকিৎসক (সার্জন), একজন অবেদনবিদ (অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক), একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি), একজন ধাই নার্স (সহকারী নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট) ও একজন আয়ার সমন্বয়ে একটি দল প্রয়োজন। কিন্তু এখানে শল্যচিকিৎসক ও অবেদনবিদ নেই। এর ফলে অস্ত্রোপচার হয় না।

কেন্দ্রটিতে বর্তমানে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আবুল কালাম আজাদ। তাঁর মূল কর্মস্থল কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। স্বাস্থ্য বিভাগের সংযুক্তির আদেশে তিনি ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে কেন্দ্রটিতে চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসক আবুল কালাম আজাদ বলেন, “সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় টিম থাকতে হয়। সেটা নেই। যে কারণে এখানে সিজার হয় না।”

জনবলসংকটে সেবা ব্যাহত

পিরোজপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রটিতে মোট অনুমোদিত পদ নয়টি। এর মধ্যে চিকিৎসা কর্মকর্তার পদ একটি। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার পদ দুটি, ফিমেল মেডিক্যাল অ্যাটেনডেন্টের পদ একটি, সহকারী নার্সিং অ্যাটেনডেন্টের পদ দুটি, গাড়িচালকের পদ ১টি, পিয়ন কাম চৌকিদার পদ একটি এবং ঝাড়ুদারের পদ একটি। তবে বর্তমানে কাগজে-কলমে কর্মরত আছেন ছয়জন। এর মধ্যে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা ৩ জন। ধাই নার্স ২ জন। এর মধ্যে একজন নার্স প্রেষণে আছেন ঢাকার মোহাম্মদপুরে। অ্যাম্বুলেন্সচালক আছেন একজন।

পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার অনুমোদিত পদ দুটি থাকলেও তিনজন কর্মরত আছেন। এটা কীভাবে হয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিরোজপুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক তুহিন কান্তি ঘোষ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এটা আমি আসার আগে হয়েছে। আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। তবে তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত জানাতে পারব।”

মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রটিতে ২৪ ঘণ্টাই জরুরি সেবা চালু থাকার কথা। তবে চিকিৎসক ও সহায়ক কর্মীর ঘাটতির পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় রাতের স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা মাহমুদা আক্তার বলেন, এখানে ২৪ ঘণ্টা কেউ না কেউ থাকেন। তবে নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় রাতে অনেক সময় গেট খোলা রাখা সম্ভব হয় না। এ কারণে অনেক সময় রোগী এসে চলে যায়।

পিরোজপুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মোট ৬২৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৩৭৪ জন। শূন্য রয়েছে ২৫৪টি পদ। সে হিসাবে ৪০ শতাংশ পদ ফাঁকা পড়ে আছে।

দোতলা ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ

শুধু জনবলসংকটই নয়, মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের দোতলা ভবনটি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়েছে। ছাদের কংক্রিট ভেঙে রড বেরিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ভবনটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। গত জানুয়ারি মাসে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও সেখানেই চলছে সেবা কার্যক্রম। অবশ্য ভবনটি কত সালে স্থাপিত হয়, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কেউ তথ্য দিতে পারেননি।

জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী শৈলেন্দ্রনাথ মণ্ডল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ইতিমধ্যে ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে চিঠি দেওয়া হয়। তবে কেন্দ্রটি খুব দ্রুত ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে ও ভবনটি পুনর্নির্মাণ করা হবে।”