‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’—মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে সচেতনতার এমন নানা স্লোগান। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্য পরামর্শ কিংবা নিরাপদ জন্মবিরতির জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে মাঠকর্মীদের খুঁজে পান না সেবাগ্রহীতারা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে চলা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ওষুধের তীব্র সংকট এবং সরকারি বিল থেকে কমিশন কাটার মতো বিস্ফোরক অভিযোগ।

পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের লক্ষ্য শুধু সন্তানসংখ্যা সীমিত রাখা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপদ মাতৃত্ব, জন্মবিরতি, উপযুক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নির্বাচন এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা। এসব বিষয়ে মানুষকে পরামর্শ দেওয়া ও প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দিতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কিন্তু কালকিনির কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ দেওয়া কিংবা উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির কার্যক্রম নিয়মিত চোখে পড়ে না। পরিবার ছোট রাখার উপায়, কোন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কার জন্য উপযোগী এবং কোনো পদ্ধতি ব্যবহারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে কী করতে হবে—এসব বিষয়ে প্রয়োজনের সময় সব ক্ষেত্রে যথাযথ পরামর্শ পাওয়া যায় না।

প্রথমবার মা হবেন আকলিমা, অপেক্ষায় পরামর্শের

গর্ভাবস্থায় সঠিক পরামর্শ নিরাপদ মাতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রয়োজনের সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কালকিনির রমজানপুর এলাকার প্রথমবার মা হতে যাওয়া আকলিমা আক্তার।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার এই প্রথম বেবি হবে। কিন্তু পরিবার পরিকল্পনার স্বাস্থ্যকর্মীরা এসে যে পরামর্শ দেবেন, তাদের আমরা পাই না। এখন তাদের ফোন করে অফিসে জানতে চাইলে এ বিষয়ে পরে কথা বলতে বলা হয়।”

কালকিনির লামিয়া (২৩), মিনারা (২৮) ও দুলুফা (২৭) নামের আরও কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কেউ কেউ পরিবার ছোট রাখতে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনের সময় পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে যথাযথ দিকনির্দেশনা না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।

স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে ভয়, ভুল ধারণা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এতে কেউ পদ্ধতি ব্যবহার বন্ধ করে দিতে পারেন, আবার কেউ নিজের স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঙ্গে উপযোগী পদ্ধতি বেছে নিতেও সমস্যায় পড়তে পারেন। এ কারণে সেবাগ্রহীতারা নিয়মিত ও প্রয়োজনভিত্তিক পরামর্শ চান।

‘লোকবল কম, সব গ্রামে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না’

সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী পরিদর্শিকা মাসুমা ইয়াসমিন বলেন, “আমাদের কয়েকটি ইউনিয়নে যেতে হয়, লোকবল কম। তাই প্রত্যেকটি গ্রামে ওইভাবে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। আমরা প্রত্যেকটি গ্রামে ঘুরে ঘুরে দেখি। প্রত্যেক অন্তঃসত্ত্বা মায়ের কাছে আমাদের নম্বর দেওয়া আছে। আমরা সে অনুযায়ী তাদের সেবা দিই।”

টিএ/ডিএ বিল থেকে কমিশন কাটার অভিযোগ

মাঠপর্যায়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে যাতায়াত ভাতা নিয়ে জটিলতার অভিযোগ তুলেছেন স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা পারভিন আক্তার। তার দাবি, মাঠে যাতায়াতের জন্য প্রাপ্য টিএ/ডিএ বিল থেকে কমিশন কেটে নেওয়া হয়। এ কারণে মাঠপর্যায়ে যাতায়াত কমে গেছে।

পারভিন আক্তার বলেন, “আমরা চেষ্টা করি গাইডলাইন দিতে। এখন আর তাদের কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের টিএ/ডিএ বিল নিয়ে ঝামেলা আছে। টিএ/ডিএ বিল থেকে কমিশন কেটে নেওয়া হয়। এ কারণে মাঠে কম যাওয়া হয়।”

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে কালকিনি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, “কারও টিএ/ডিএ এখান থেকে কাটা হয় না। অনলাইনের মাধ্যমে প্রত্যেকের কাছে চলে যায়।”

ওষুধ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট

পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ। তবে কালকিনি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে এসব সামগ্রীর সংকট থাকার কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন যাবৎ জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী এবং ওষুধের সংকট রয়েছে। তবে মাঠকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতন করার কথা। কেউ তা না করলে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”