সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার লক্ষ্যে ১৯ বছর আগে ময়মনসিংহের ভালুকায় ২০ শয্যার একটি ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে এখানে রোগী ভর্তি করার কোনো সুযোগ নেই এবং অস্ত্রোপচারের সুবিধাও নেই।
উদ্বোধনের পর দীর্ঘ ১৫ বছর এই কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ অব্যবহৃত ছিল। বছর চারেক আগে এর কার্যক্রম আংশিকভাবে শুরু হলেও তা এখনো কেবল বহির্বিভাগের সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জনবল সংকটের কারণে এখানে রোগীদের ভর্তি করা যাচ্ছে না। ১৯ বছর ধরে প্রায় দুই কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি এখানে পড়ে আছে, যার অধিকাংশ এখন নষ্ট হয়ে গেছে।
ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে তিনতলা একটি ভবনে এই ট্রমা সেন্টারটি অবস্থিত। ২০০৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। দীর্ঘকাল অচল থাকার পর ২০২২ সালের শেষ দিকে এখানে বহির্বিভাগে রোগী দেখা শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত এই বহির্বিভাগের সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
বর্তমানে ট্রমা সেন্টারে তিনজন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। তাঁরা হলেন জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অর্থোপেডিকস) মো. সোহেল রানা, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) সুলতান ফজলে রাব্বী এবং আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ। এছাড়া এখানে ১১ জন নার্স, একজন এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও একজন ফার্মাসিস্ট দায়িত্ব পালন করছেন।
কোমরের ব্যথায় দুই সপ্তাহ আগে এই ট্রমা সেন্টারে এসেছিলেন ভালুকা উপজেলার মেদুয়ারি গ্রামের তবারক হোসেন। গত বৃহস্পতিবার পুনরায় চিকিৎসক দেখাতে এসে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “রোগী আইলে ভর্তি রাহে না। মাইনস্যের যদি কামেই না লাগে, তাইলে এই হাসপাতাল কইরা লাভ অইলো কী?”
মূলত দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়। এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু থাকলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো এবং রোগীরা দ্রুত সেবা পেত। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম না থাকায় গুরুতর আহতদের এখানে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ভালুকা ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে উপজেলায় ৬৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫১ জন আহত হয়েছেন। জরুরি সেবা চালু না থাকায় তাঁদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়।
ভালুকা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা আতিকুর রহমান মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “ট্রমা সেন্টার মূলত দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসার জন্য। এটি পূর্ণাঙ্গ চালু থাকলে রোগীরা দ্রুত সেবা পেত। অনেক প্রাণ বেঁচে যেত।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০ শয্যার এই সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বর্তমান জনবল একেবারেই অপর্যাপ্ত। হাসপাতালের জনবলকাঠামো অনুযায়ী এখানে মোট ৪২ জন কর্মীর প্রয়োজন। যার মধ্যে ১ জন সহকারী পরিচালক, ১ জন জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট, ২ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, ৪ থেকে ৬ জন চিকিৎসা কর্মকর্তা, ১ জন সেবা তত্ত্বাবধায়ক এবং ১০ থেকে ১২ জন নার্স ছাড়াও বিভিন্ন পদে আরও ১৯ জন কর্মী প্রয়োজন।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “ট্রমা সেন্টারে পূর্ণাঙ্গ অন্তর্বিভাগ সেবা চালুর চেষ্টা চলছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবলের সংকট। ২৪ ঘণ্টার দায়িত্ব পালনের জন্য আলাদা ডিউটি চিকিৎসকের পদ নেই। তাই স্থায়ীভাবে অন্তর্বিভাগ সেবা চালু করতে নতুন পদ সৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ জরুরি। এ ছাড়া অস্ত্রোপচার কক্ষ চালু করতে জেনারেটরসহ কিছু যন্ত্রপাতি ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) মেরামত করা প্রয়োজন।”
ভালুকা উপজেলার রাজৈ এলাকার শফিকুল ইসলাম ফকির পা ভেঙে যাওয়ার পর এই ট্রমা সেন্টারে এসে এক্স-রে ও প্লাস্টার করিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ট্রমা সেন্টারের সামনে তিনি মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “এইনো ভর্তি থাহন যায় না। হাসপাতালে থাকতে পারলে সব সময় ডাক্তারে দেখতো। বাড়িত গেলে অসুবিধা লাগলেই আবার হাসপাতালে আসতে হবে।”
ট্রমা সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গত ৮ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২৬ হাজার ১৩ জন সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১ অক্টোবর ১৫০ জন, ৩ অক্টোবর ১২৪ জন, ৪ অক্টোবর ২৫৬ জন এবং ৫ অক্টোবর ১৮৯ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন।
ভবনটি পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রথম তলায় বহির্বিভাগের কার্যক্রম চলছে। তবে দ্বিতীয় তলার চিকিৎসকদের কয়েকটি কক্ষ তালাবদ্ধ। তৃতীয় তলার বিভিন্ন কক্ষে অক্সিজেন সিলিন্ডার তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। সিঁড়ির পাশে শয্যার যন্ত্রপাতি ও ওষুধের বাক্স এবং ছাদে বিছানা, বালিশ ও চেয়ার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে।
সেন্টারটি চালুর জন্য ২০০৭ সালে প্রায় দুই কোটি টাকার সরঞ্জাম দেওয়া হলেও অধিকাংশ জিনিসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অথবা সেগুলো বিকল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অস্ত্রোপচার কক্ষের এসি ও জেনারেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এখন অকেজো।
ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ফখরুল হাসান চৌধুরী মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “ট্রমা সেন্টারটির উদ্দেশ্য ছিল অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ—দুই ধরনেরই সেবা দেওয়া। এটি পূর্ণাঙ্গ চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে; কিন্তু এখনো সেই জনবল পাওয়া যায়নি। এ কারণে অন্তর্বিভাগ চালু করা যাচ্ছে না।”