দুনিয়ায় বিশ্বাসের স্তম্ভগুলো কীভাবে ধীরে ধীরে ধসে পড়ে, তার একটি সাম্প্রতিক ও বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের কাছ থেকে আমরা শিক্ষা পেয়েছি যে, ‘সত্য কথা বলবা, বড়দের মানবা, আর মশারির ভেতরে শুইবা।’ তবে আমরা বাঙালিরা কি আর মশারি টাঙানোর মতো খাটুনি খাটতে চাই? তাই আমাদের দীর্ঘদিনের ভরসা ছিল একটি সবুজ রঙের গোল চাকা—মশার কয়েল।
আমাদের কাছে মশার কয়েল ছিল এক অলৌকিক অস্ত্র। প্যাকেট খোলার মুহূর্তেই মনে হতো, ‘আজকে মশার বংশ নিপাত হবে!’ কয়েলে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছাড়তাম এবং মনে মনে জেমস বন্ডের মতো মুচকি হেসে বলতাম, ‘খেলা শুরু, বেটা মশার দল!’
কিন্তু আমার বিশ্বাসের ভিতটি গত মঙ্গলবার রাতে ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল। ঘটনাটি ঘটেছিল রাত ১২টার দিকে। ঘরে তখন লোডশেডিং। অন্ধকারের মাঝে আমি রোমান্টিক মুডে না গিয়ে মশার সঙ্গে রীতিমতো ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার’ লড়ছিলাম। এক হাতে ছিল ইলেকট্রিক ব্যাট, আর অন্য হাতে কয়েল ও দেশলাই।
সযত্নে স্ট্যান্ডের ওপর কয়েলটি বসিয়ে আগুন জ্বালালাম। ভুর ভুর করে ধোঁয়া উঠতে শুরু করল। ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই পাহাড়ের কুয়াশার মতো বিষাক্ত অথচ সুন্দর হয়ে উঠল। আমি ভেবেছিলাম, মশার দল এখন ধোঁয়ায় কাশি তুলতে তুলতে আকুল হয়ে পালাবে অথবা বিষক্রিয়ায় স্ট্রোক করবে। এই ভেবে আমি শান্তিতে হাত-পা ছড়িয়ে খাটে শুলাম। মনে এক অপার প্রশান্তি।
কিন্তু ঠিক পাঁচ মিনিট পর কানে এল এক খসখস শব্দ। কয়েলের দিকে তাকিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার চোখ কপালে উঠল এবং মনে হলো আত্মাটি ক্ষণিকের জন্য শরীর ছেড়ে চলে গেছে। একটি বিশাল আকৃতির গাম্বিয়া মার্কা মশা—যার সাইজ প্রায় কাকের বাচ্চার মতো—উড়ে এসে সরাসরি জ্বলন্ত কয়েলের আগায় গিয়ে বসল!
হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন। যে কয়েলের ধোঁয়ায় মানুষের হাঁপানি হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, সেই জ্বলন্ত কয়েলের লাল টকটকে ছাইয়ের ওপর মশাটি পরম শান্তিতে পা ছড়িয়ে বসল। আমি চোখ ডলে আবারও তাকালাম। ভুল দেখিনি। মশাটি কয়েলের ওপর বসে হাত-মুখ ধুচ্ছে! আমার মনে হলো মশাটি আমার দিকে তাকিয়ে এক ব্যঙ্গাত্মক হাসি দিল। তার অভিব্যক্তি ছিল অনেকটা এই রকম:
‘কী রে ভাই? এগুলা কী জ্বালাস? শীতকালে একটু গরম সেঁকার জায়গা পাচ্ছিলাম না, থ্যাংকস কয়েলটা জ্বালানোর জন্য! আর একটু ধোঁয়া দে, বগলটা একটু ঘাইমা গেছে, শুকায়া নেই!’
আমি হয়ে গেলাম স্তব্ধ, নিস্তব্ধ এবং পুরোপুরি হতবাক। যে কয়েলকে আমি এতদিন ‘মশাবিনাশী পারমাণবিক অস্ত্র’ বলে বিশ্বাস করতাম, মশাটি সেটিকে বডি স্প্রে এবং রুম হিটার বানিয়ে ফেলেছে। আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম এবং মশাটির কাছে গেলাম। মশাটি কিন্তু পালাল না। উল্টো কয়েলের ছাই থেকে সামান্য ধোঁয়া নিশ্বাসে টেনে নিয়ে একটি আড়মোড়া ভাঙল, যেন কক্সবাজারের সৈকতে সানবাথ নিচ্ছে!
আমার তখন মনে হলো, প্রেমিকা ছ্যাঁকা দিলে কষ্ট হয় কিন্তু তা সহ্য করা যায়। পরীক্ষায় ফেল করলে কান্নাকাটি করে সামলে ওঠা যায়। কিন্তু কয়েলের ওপর মশাকে এভাবে বসে থাকতে দেখলে জীবনের প্রতি সমস্ত বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আস্থা এক সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উড়ে যায়!
সেদিন রাতে আমি উপলব্ধি করলাম যে, ডারউইনের বিবর্তনবাদ একদম সত্য। আমাদের দেশের মশারা এখন আর সাধারণ মশা নেই, তারা বিশেষ বাহিনী বা স্পেশাল ফোর্স থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘সুপার মশা’! কয়েলের ধোঁয়া এখন আর তাদের মারে না, বরং তাদের অ্যারোমাথেরাপি দেয়। তারা কয়েলের ধোঁয়া খেয়ে জিমে যায়, পুশআপ দেয় এবং রাতে মানুষের রক্ত খায় হেলথ ড্রিংক হিসেবে!
অবশেষে আমি আস্তে করে কয়েলটি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিলাম। কয়েলকে স্যালুট জানিয়ে বললাম, ‘ভাই রে, তোর জীবন ব্যর্থ। তুই রিটায়ারমেন্টে যা।’ এরপর চুপচাপ উঠে গিয়ে পুরোনো ও ফুটো হওয়া মশারিটি টাঙালাম। কারণ, এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে মশার কয়েল ধোঁকা দিতে পারে, কিন্তু তালি দেওয়া মশারির কাপড় কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করে না!