ঝালকাঠিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমবর্ধমান। চলতি বছরের গত আট মাসে জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ৯৪৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যায় ঝালকাঠি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজন কলেজছাত্রী এবং একজন চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৯০৭ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৬০ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকাকালীন গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২২ জন নতুন করে ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও হাসপাতালের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে নতুন করে সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মশারি সরবরাহের ব্যর্থতা এবং ডেঙ্গু, হাম ও সাধারণ রোগীদের একই কক্ষে রাখার বিষয়টি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই হাসপাতাল থেকে মশারি পাওয়া যায় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে মশারি দেওয়া হলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে না।

গত আট মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৪১৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে। এ ছাড়া রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৮৮ জন, কাঁঠালিয়ায় ১১৭ জন এবং নলছিটিতে ১২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে সদর হাসপাতালে ১৬ জন, রাজাপুরে ১২ জন, কাঁঠালিয়ায় ৩ জন এবং নলছিটিতে ৭ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। জেলা শহরের কাটপট্টি, বান্দাঘাট, বাঁশপট্টি, কলাবাগান, স্টেশন রোড, সিটি পার্ক ও ফকিরবাড়িসহ মোট ৯টি এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সদর হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীদের শয্যার পাশে মশারি টাঙানো নেই। সদর উপজেলার পিপলিতা গ্রামের মো. সালেহ জানান, "আমার ছেলেসহ ডেঙ্গু রোগী কাউকেই হাসপাতাল থেকে মশারি দেওয়া হয়নি। মশারি না দিলে আমরা কীভাবে টাঙাব? ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে মশারি অত্যন্ত জরুরি। কারণ মশা কামড়ানোর মাধ্যমে অন্য মানুষের মধ্যেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে পারে।"

পাশের শয্যায় থাকা রোগীর মা নূরজাহান বেগম বলেন, "হাসপাতাল থেকে মশারি না দেওয়ায় পরে বাড়ি থেকে মশারি নিয়ে এসেছি। কিন্তু ডেঙ্গু ওয়ার্ডের অন্য রোগীদের কারও মশারি টাঙানো দেখি না। এ কারণে আমরাও নিয়মিত ব্যবহার করছি না। অথচ ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে মশারি ব্যবহার করা খুবই প্রয়োজন।"

সীমিত জায়গার কারণে ডেঙ্গু ও সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি অবস্থান করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পেটে ব্যথা নিয়ে ভর্তি রহিমা বেগম বলেন, "ডেঙ্গু রোগীদের যে মশা কামড় দিয়েছে, সেই মশা যদি আমাকে কামড় দেয়, তাহলে আমিও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারি। আমি পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে এসেছি; পরে যেন ডেঙ্গু নিয়ে বাড়ি ফিরতে না হয়, সেটাই এখন ভয়। এখানে চিকিৎসাসেবা ভালো পেয়েছি এবং এখন মোটামুটি সুস্থ আছি। কিন্তু একই জায়গায় অনেক ধরনের রোগী ভর্তি থাকায় আতঙ্ক লাগে। তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু রোগীর জন্য আলাদা কক্ষ, হাম রোগীর জন্য আলাদা কক্ষ এবং সাধারণ রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষ থাকা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা, ডেঙ্গু রোগীদের কেউ মশারি ব্যবহার করছে না। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে যে মশা কামড় দিয়েছে, সেই মশা যদি আমাকে কামড় দেয়, তাহলে আমিও আক্রান্ত হতে পারি।"

মানপাশা গ্রামের আয়শা আক্তার জানান, "হাম ও ডেঙ্গু রোগীকে অনেক সময় পাশাপাশি রাখা হচ্ছে। মাঝে মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর পাশেই হাম রোগী ভর্তি থাকে। আবার ডেঙ্গু রোগীরাও মশারি ব্যবহার করছে না। এতে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অন্য রোগী এবং তাদের স্বজনদের মধ্যেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তিনি বলেন, দেখলে বোঝার উপায় নেই কে ডেঙ্গু রোগী আর কে সাধারণ রোগী। ডেঙ্গু রোগীকে যে মশা কামড় দিয়েছে, সেই মশা যদি আমাদের রোগীকে কামড়ায়, তাহলে তারও ডেঙ্গু হতে পারে।"

এদিকে, হাসপাতালের এক নার্স মশারি না ব্যবহারের বিষয়ে জানান, "রোগীদের বারবার মশারি ব্যবহারের জন্য বলা হলেও অনেকেই তা খুলে রাখেন। গরমের কারণে কেউ কেউ মশারি ব্যবহার করতে চান না। এ কারণেই এখন অনেককে মশারি দেওয়া হচ্ছে না" বলে তিনি জানান। তবে রোগীদের অভিযোগ এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়।

সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট আবুয়াল হাসান বলেন, "এ বছর ডেঙ্গু রোগীর চাপ কমছেই না। আমরা আশা করেছিলাম রোগীর চাপ কিছুটা কমে যাবে। কিন্তু প্রতিনিয়ত নতুন রোগী আসছেন। একজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসা সম্পন্ন করতে সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় দিন সময় লাগে। এর মধ্যেই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। পাশাপাশি অন্যান্য রোগের রোগীরাও ভর্তি হচ্ছেন। ফলে বর্তমানে হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি।"

মশারি সরবরাহ না করার প্রশ্নে তিনি প্রথমে ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, "এরকম কেউ আছে দেখাতে পারবেন? মশারি দিলে তারা গরমের কারণে ব্যবহার করে না। সেখানে আমরা কী করব? সবাইকে তো মশারি দেওয়া হয়। আপনি দেখাতে পারবেন যে মশারি দেওয়া হয়নি?"

পরবর্তীতে একজন নার্সসহ ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে কিছু রোগী মশারি না পাওয়ার কথা জানালে নার্স বলেন, "সবাইকে মশারি দেওয়া হবে। তবে রোগীরা যদি মশারি ব্যবহার না করেন, তাহলে তাদের কিছু করার থাকে না।"

আবুয়াল হাসান আরও বলেন, "ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যেসব জায়গায় পানি জমে থাকে, সেখান থেকেই এডিস মশার প্রজনন হয়। তাই এসব জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।"

সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাসুম ইফতেখার বলেন, "হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করা হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা রয়েছে। চিকিৎসাসেবায় কোনো সমস্যা নেই। সকল রোগীকে মশারি দেওয়া হয়েছে এবং মশারি ব্যবহারের জন্য নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। যারা নির্দেশনা মানবেন না, তাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হবে।"

সচেতন মহলের মতে, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, ভাঙা রাস্তার আশপাশে পানি জমা এবং মানুষের অসচেতনতা ডেঙ্গু বৃদ্ধির প্রধান কারণ। কালাম নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, "ঝালকাঠির ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বিভিন্ন জায়গায় ময়লা জমে থাকে। রাস্তার আশপাশেও অনেক জায়গায় পানি জমে থাকে। এর পাশাপাশি মানুষের মধ্যেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেকে নিজের বাড়ির আশপাশও পরিষ্কার রাখেন না। ফুলের টব, বাড়ির পাশের গর্তসহ বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে। এসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার করা দরকার। তাহলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।"

রহিম মিয়া পৌরসভার মশকনিধন কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "পৌর প্রশাসক কী কাজ করছেন, সেটা মানুষই ভালো বলতে পারবে। মাঝে মধ্যে লোক দেখানোর জন্য স্প্রে করা হয়। কোনো প্রোগ্রাম হলে সাংবাদিক ডেকে এনে ময়লা পরিষ্কার ও মশকনিধনের ওষুধ ছিটানো হয়। সাংবাদিকদের ভিডিও করা শেষ হলে এরপর আর তেমন কার্যক্রম দেখা যায় না। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন অন্তত এক থেকে দুইবার নিয়মিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও মশার প্রজননস্থলে মশকনিধনের ওষুধ দেওয়া হলে মশা অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু নিয়মিত সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে না।"

ঝালকাঠি পৌরসভার প্রশাসক জুলিয়া সুকায়নার কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি না হয়ে বলেন, "আপনি যা লেখার লিখে দেন।"

ইয়ুথ অ্যাকশন সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রাহাত মাঝি বলেন, "ডেঙ্গু প্রতিরোধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। আমরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, বৃক্ষরোপণসহ ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। শুধু হাসপাতাল বা প্রশাসনের উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এ জন্য সমাজের প্রতিটি মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।"

জেলা সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ুন কবির উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "ঝালকাঠি জেলা সদরসহ চার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সদের ডেঙ্গু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় স্যালাইন ও ওষুধ পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি নেই। তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে। কেউ যদি মশারি ব্যবহারের নির্দেশনা না মানেন, তাহলে তাকে বুঝিয়ে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে। যারা ডেঙ্গু রোগী হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, তাদের ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং সব ধরনের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।"