বরগুনায় ডেঙ্গু সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এই জেলায় প্রতিদিন গড়ে ৩৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। সর্বশেষ এক সপ্তাহের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৩৮ জন রোগী। এর ফলে জেলায় মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৩০ জনে। উল্লেখ্য, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
হাসপাতালে রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়লেও একটি উদ্বেগজনক বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে—চিকিৎসাধীন অনেক রোগী মশারি ব্যবহার করছেন না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, এই উদাসীনতার কারণে হাসপাতালের ভেতরেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বরগুনা সিভিল সার্জন অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে ভর্তি হওয়া মোট ২৩৮ জন রোগীর মধ্যে ১৬২ জনকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে এবং বাকি ৭৬ জনকে জেলার অন্য পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
বর্তমানে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে মোট ৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যার সংখ্যা মাত্র ৫০টি, যার ফলে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী সেখানে অবস্থান করছেন। পুরো জেলায় বর্তমানে মোট চিকিৎসা কেন্দ্রের সংখ্যা ৯৪ জন বলে জানা গেছে।
গত বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে আটটার দিকে বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড পরিদর্শনে দেখা যায়, বেশ কিছু রোগী মশারি ছাড়াই শয্যায় শুয়ে আছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বারবার মশারি ব্যবহারের অনুরোধ জানালেও অনেক রোগী তা মানছেন না। এই পরিস্থিতি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের সচেতনতার চরম ঘাটতিকে ফুটিয়ে তুলেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বরগুনা পৌর শহরের নয়াকাটা এলাকার বাসিন্দা আবুল বাশার বলেন, “জ্বর ও শরীর খারাপ হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। চিকিৎসা নিচ্ছি। মশারি ব্যবহার করা যে জরুরি, তা এখন বুঝতে পারছি। সুস্থ হতে চিকিৎসার পাশাপাশি নিজেদেরও সচেতন থাকতে হবে।”
পৌর শহরের বটতলা এলাকার রোগী রফিকুল ইসলাম জানান, “ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছি না। হাসপাতাল থেকে মশারি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে মশার কামড় এড়িয়ে চলা এবং আশপাশ পরিষ্কার রাখা জরুরি।”
অন্যদিকে, সদরের নলটোনা এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আউয়াল হাওলাদার বলেন, “জ্বর হওয়ার পর প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হয়েছিল। পরে পরীক্ষা করানোর পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া উচিত।”
বুড়িরচর এলাকার আরেক রোগী মনির হোসেন বলেন, “ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এখানে চিকিৎসা নিচ্ছি। মশারি ব্যবহারের বিষয়ে হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। বাড়ির আশপাশে যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।”
বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালে ৫০টি শয্যা নির্ধারিত থাকলেও বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ৬৩ জন। আমরা রোগীদের বারবার মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছি। কিন্তু অনেকেই তা মানছেন না, যা উদ্বেগজনক।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। তাই হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে, কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিকিৎসার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
প্রতিদিন গড়ে ৩৪ জন রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এই পরিসংখ্যান ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক সময়ে রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি মশার বংশবিস্তার রোধ এবং মশারি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানো না গেলে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।