দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ, অথচ মশা দমনে নির্ধারিত সরকারি ব্যবস্থার একটি বড় অংশই বর্তমানে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে আছে। নিয়ম অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ের ওয়ার্ড থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত মোট ৪৮ হাজারের বেশি কমিটি থাকার কথা। তবে বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক; অনেক এলাকায় এখনো কমিটি গঠন করা হয়নি, আর যেখানে কমিটি হয়েছে সেখানে কোনো কার্যকর কার্যক্রম নেই। এমনকি দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক উচ্চপদস্থ official এই বিষয়ে অবগত নন যে, এসব কমিটি গঠনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। জনস্বাস্থ্যের এই চরম ঝুঁকির সময়ে প্রশাসনের এমন উদাসীনতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, গত সোম ও মঙ্গলবার মাত্র দুই দিনে ডেঙ্গুতে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে এ রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮১ জনে। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজারের বেশি মানুষ। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কেবল হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা বাড়িয়ে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা যথেষ্ট নয়। রোগের বিস্তার রোধ করতে হলে মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের ওপর। ২০১৯ সালের জাতীয় নির্দেশিকায় এই দায়িত্ব পালনের একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন স্তরে কার নেতৃত্বে কমিটি হবে, তাদের কাজ কী হবে এবং কতবার সভা করতে হবে—সবই সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের মূল কাজ হলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের সমন্বয় করা, প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং নিয়মিত তদারকি করা। সাত বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও নির্দেশনার বাস্তবায়ন নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা থাকলে প্রশ্ন জাগে, বিভাগটি এত দিন আসলে কী তদারকি করেছে?

স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, “কমিটিগুলো সক্রিয় আছে।” কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা এই দাবির সঙ্গে একেবারেই মেলে না। কোথাও ওয়ার্ড কমিটি নেই, আবার কোথাও গঠিত কমিটির কোনো সভা হয়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কেবল অনুমাননির্ভর আশ্বাসের মাধ্যমে এই বড় অসংগতি আড়াল করা সম্ভব নয়। কোন কমিটি কোথায় সক্রিয় আছে, সর্বশেষ কবে সভা করেছে এবং কী কী কাজ করেছে, তার সঠিক তথ্য বিভাগের হাতে থাকা প্রয়োজন ছিল।

ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানী ঢাকা বা বড় শহরের সমস্যা নয়, বরং দেশের প্রতিটি জেলার সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ প্রতিরোধব্যবস্থার ক্ষেত্রে এখনো শহরকেন্দ্রিক চিন্তার প্রভাব রয়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলে মশা নিয়ন্ত্রণের নিয়মিত কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলো অকার্যকর থাকায় স্থানীয়ভাবে ঝুঁকি শনাক্ত করা, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধমূলক কাজ চালানোর সুযোগ নষ্ট হচ্ছে। ডেঙ্গুর বর্তমান বিস্তারের সঙ্গে সংগতি রেখে সম্পদ, জনবল ও তদারকির ব্যবস্থা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির পর বিভিন্ন এলাকায় কিছু তৎপরতা শুরু হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু জনস্বাস্থ্য রক্ষার মতো নিয়মিত দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিবার কি সর্বোচ্চ পর্যায়ের ঘোষণার প্রয়োজন হবে? সপ্তাহের একটি দিনের কর্মসূচি কিংবা কয়েক মাসের সাময়িক অভিযান দিয়ে বছরব্যাপী এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রমে মশা নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ীভাবে যুক্ত করতে হবে। ডিসেম্বরের পর যদি কার্যক্রম থেমে যায়, তবে বর্তমান উদ্যোগের সুফলও ধরে রাখা যাবে না।

স্থানীয় সরকার বিভাগকে অবিলম্বে দেশব্যাপী এই কমিটিগুলোর প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে তা প্রকাশ করতে হবে। যেখানে কমিটি নেই, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা গঠন করতে হবে এবং যেখানে নিষ্ক্রিয়, সেগুলোকে দ্রুত সচল করতে হবে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করতে হবে। স্থানীয় পরিস্থিতি এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করার কাজে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। শুধু দৃশ্যমান অভিযান চালিয়ে সাফল্যের দাবি করলে চলবে না; কাজে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্মকর্তাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।