সারা দেশে মশা নিধনের জন্য কাগজে-কলমে ৪৮ হাজারের বেশি কমিটির কথা থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত এই বিশাল কমিটি কাঠামোর কথা নির্দেশিকায় থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তা কার্যকর নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যদি এই বিষয়ে আন্তরিক ও উদ্যোগী না হয়, তবে দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।
বর্তমানে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মকভাবে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার আরও ১০ জন এবং তার আগের দিন ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে এ নিয়ে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮১ জনে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই সংখ্যা আরও বাড়বে।
বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলাতেই ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। এই রোগের বাহক এডিস মশা, যার নিধনের মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের ওপর ন্যস্ত। তবে অভিযোগ উঠেছে, বছরের পর বছর তারা এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না।
২০১৯ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ জাতীয় নির্দেশিকা’য় ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জাতীয় পর্যায়ে কমিটি গঠনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই নির্দেশিকায় প্রতিটি স্তরে কমিটির সদস্য সংখ্যা, গঠন প্রক্রিয়া এবং কার্যপরিধি বিস্তারিতভাবে লেখা আছে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় কমিটি এবং সিটি করপোরেশনগুলোর কমিটি ছাড়া বাকি সব কমিটি কার্যত নিষ্ক্রিয়। বিশেষ করে জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিগুলো নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা বা কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়নি।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলাম গত সোমবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “জাতীয় কমিটি ও ১৩টি সিটি করপোরেশনের কমিটিগুলো মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। ৩৩০টি পৌরসভার কমিটিগুলো কাজ করছে।” অন্যান্য কমিটির বিষয়ে তিনি দাবি করেন, “নিশ্চয়ই কমিটিগুলো অ্যাকটিভ আছে। তারা কাজ করছে।”
অথচ মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সবচেয়ে প্রাথমিক স্তরের কমিটি হলো ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায়ে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ কমিটি’। এই ১১ সদস্যের কমিটির সভাপতি হলেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার। দেশে ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন এবং প্রতি ইউনিয়নে ৯টি ওয়ার্ড হিসেবে মোট ৪১ হাজার ৩৯১টি ওয়ার্ড রয়েছে। কিন্তু কোনো ইউনিয়নের কোনো ওয়ার্ডে এই কমিটি আছে বলে জানা যায়নি। এর পরবর্তী স্তরে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি থাকার কথা, যার সভাপতি হন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান।
ইউনিয়নের ওপরের স্তরে পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে দুই ধরনের কমিটি রয়েছে। দেশে ৩৩০টি পৌরসভা ও ৫০৩টি উপজেলা রয়েছে, যাদের সভাপতি যথাক্রমে পৌর মেয়র এবং উপজেলা চেয়ারম্যান। জেলা পর্যায়ে ৬৪টি এবং ১৩টি সিটি করপোরেশনে একটি করে কমিটি থাকার কথা। এছাড়া প্রতিটি সিটি করপোরেশনের ৬৬৮টি ওয়ার্ড এবং পৌরসভার অন্তত ৯৯০টি ওয়ার্ডে আলাদা কমিটি থাকার কথা বলা হয়েছে।
সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে ২৪ সদস্যের ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি’। এই কমিটিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধি, ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আরও ৫ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত আছেন।
ডেঙ্গু বিষয়ে বর্তমান সরকারকে পরামর্শ প্রদানকারী একজন গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রতিটি পৌরসভায় কমিটি আছে বা থাকার কথা। কিন্তু ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠনের কথা জানা নেই। বড় বড় নীতিনির্ধারণী সভাতেও এ কথা শোনা যায়নি।”
হিসাব অনুযায়ী, ওয়ার্ড থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত মোট কমিটির সংখ্যা ৪৮ হাজার ৫৫৯টি। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় এত বিপুল সংখ্যক কমিটি গঠনের কথা অনেকেই জানেন না। ওই গবেষক পুনরায় উল্লেখ করেন, “প্রতিটি পৌরসভায় কমিটি আছে বা থাকার কথা। কিন্তু ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠনের কথা জানা নেই। বড় বড় নীতিনির্ধারণী সভাতেও এ কথা শোনা যায়নি।”
২০১৯ সালের জাতীয় নির্দেশিকায় স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার বিভাগ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর-সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, গণযোগাযোগমাধ্যম ও এনজিওসহ সব অংশীজনের দায়িত্ব নির্ধারণ ও সমন্বয় করবে। এছাড়া বছরব্যাপী কার্যক্রম গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং তদারকির পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে আসা সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে দেশব্যাপী মশা নিধনের প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপের পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্বও তাদের।
জাতীয় কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, “এই কমিটি গৃহীত ও বাস্তবায়িত কার্যক্রম পর্যালোচনা, মূল্যায়ন, তদারকি ও সমন্বয় করবে; প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনা, নীতি ও কর্মকৌশল প্রণয়ন এবং সেগুলো হালনাগাদ করবে।” নিয়ম অনুযায়ী বছরে অন্তত চারবার এই কমিটির সভা হতে হবে।
এ বছর ১১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে দেশবাসীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিতে আহ্বান জানান। তখনো স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এরপর প্রধানমন্ত্রী ১২ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন, যা প্রতি শনিবার পালিত হচ্ছে এবং চলবে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
সিটি করপোরেশনের মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ কমিটির জন্য মশা নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে ৩৩টি নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। একইভাবে জেলা, পৌর ও উপজেলা কমিটির জন্য কাজের তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং মাসে একবার সভা করার কথা বলা হয়েছে। পৌরসভার জন্য বলা হয়েছে, “মশার লার্ভার উৎসস্থল বিনষ্টকরণে আইনি পদক্ষেপ হিসেবে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ।” এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিকেও মাসে একবার পরিস্থিতি পর্যালোচনার সভা করতে বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগের ফলে কিছু তৎপরতা শুরু হয়েছে। কুমিল্লার জেলা প্রশাসন গতকাল মুক্তকণ্ঠের প্রতিনিধিকে জানিয়েছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি করা হয়েছে এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডেও কমিটি গঠিত হয়েছে।
তবে সব জায়গায় চিত্র এক নয়। পাবনা জেলার বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক রুনাল্ট চাকমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য কমিটি গঠনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি। তাই উপজেলায় এ-সংক্রান্ত কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ চলছে।”
বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হামিদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত মাসিক সভায় চেয়ারম্যানদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এর পর থেকে আমরা ইউপি সদস্য, গ্রাম পুলিশ ও এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাজ, মানুষকে সচেতন করার কাজ এবং প্রচারের কাজ হাতে নিয়েছি।”
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল আটটা থেকে মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত) সারা দেশে ১ হাজার ৯৯৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ বছর মোট ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৯০ হাজার ৩৫৬ জন। গতকাল সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৫ হাজার ৭৭৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল আমিন মুক্তকণ্ঠকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি শনিবার ফগার মেশিন দিয়ে মশা নিধন করা হচ্ছে, তবে পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের কোনোটিতেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটি নেই। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, টাস্কফোর্স কমিটি করা হলেও আগে কাউন্সিলরদের নিয়ে গঠিত ওয়ার্ড কমিটিগুলো এখন আর কার্যকর নেই।
যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো কমিটির সভা হয়নি, তবে হবে। বর্তমানে প্রতিদিন একটি এলাকা করে পরিষ্কার করা হচ্ছে। অন্যদিকে ওই উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুর কবির জানান, ইউনিয়ন কমিটির সভা হয়েছে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। তবে কেশবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন বলেন, গঠিত কমিটির কোনো সভা হয়নি, কেবল বিক্ষিপ্তভাবে ময়লা পরিষ্কার করা হচ্ছে।
রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফজালুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ইউএনওর নির্দেশে বার্ষিক উন্নয়ন সহায়তা তহবিল থেকে ওষুধ ও ফগার মেশিন কেনা হয়েছে এবং গ্রাম পুলিশ আবদুর রহমানকে তা চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে মশা নিধনের কোনো কমিটি এখনো হয়নি। সিলেট সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নেও কোনো ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটি নেই বলে জানা গেছে।
মূলত ডেঙ্গু আগে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার মতো বড় শহরকেন্দ্রিক সমস্যা ছিল, তাই সরকারি উদ্যোগও ছিল শহরকেন্দ্রিক। কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এখন গ্রামের মানুষের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মশা নিধনের তেমন কোনো কার্যক্রম নেই।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এত কমিটির কথা অনেকের জানা নেই। এসব কমিটি সচল করা, তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সব কমিটিকে যদি সক্রিয় করা সম্ভব হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ সম্পৃক্ত হবে, দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় আন্দোলন গড়ে উঠবে।”