চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট—এই আট মাসে ডেঙ্গু সংক্রমণ তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই একটি তথ্যই যথেষ্ট প্রমাণ করে যে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও উদ্যোগে বড় ঘাটতি ছিল। শুধু তাই নয়, এবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে খুলনা, রাজশাহী, বরিশালের শহর ও গ্রামাঞ্চলেও সমান গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইতিমধ্যে টিকা দেওয়ার পরও হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত থাকায় স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ রয়েছে। জুলাই থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী ছিল; আগস্টে সংক্রমণ ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই সরকারি হাসপাতালে খালি শয্যা নেই, বেসরকারি হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বরাদ্দ শয্যা পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে কী বিপর্যয় ঘটতে পারে, তা ২০১৯ ও ২০২৩ সালের অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তিন বছরের মধ্যে একই সময়ে এটাই সর্বোচ্চ। এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১১০ জন রোগীর। আক্রান্তদের মধ্যে ১৬ হাজারের বেশি রোগী ঢাকা বিভাগের। অর্থাৎ ঢাকার বাইরেও এবার রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক দুটি কারণে: প্রথমত, মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এখনো মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক; দ্বিতীয়ত, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা অপর্যাপ্ত।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, এবার ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন-৩ ধরনটি প্রধান হয়ে উঠেছে, তবে ডেন-২ ধরনটিও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ছড়াচ্ছে। অপেক্ষাকৃত উষ্ণ আবহাওয়া ও থেমে থেমে বৃষ্টির প্রবণতা থেকে কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে সংক্রমণ ভয়াবহ আকার নিতে পারে। কিন্তু সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নির্দেশনা আসার পরও এডিস মশা নির্মূলে বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো পরিকল্পনা ও উদ্যোগ দেখা যায়নি। জনগণকে সম্পৃক্ত করে মশার প্রজননস্থল ও লার্ভা ধ্বংসের বদলে আগের মতোই মশার ওষুধ ছিটানোর মধ্যেই মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। আরও বেদনাদায়ক সত্য হলো, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি বড় শহরের বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যক্রমই নেই বললেই চলে।
আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ মোকাবিলা করেও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর কৌশল গড়ে তুলতে না পারা একটি বড় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা বলেই আমরা মনে করি। নাগরিকদের মূল্যবান প্রাণ দিয়ে সেই ব্যর্থতার মাশুল দিতে হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ডেঙ্গুর চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা। অনেক পরিবারকে চিকিৎসার খরচ মেটাতে ঋণ পর্যন্ত নিতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যতই প্রস্তুতির কথা বলুক, রোগীদের শয্যায় ভর্তি করাতে স্বজনদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে দেখা যায়; এই চিত্রই বলে দেয়, প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয়। তাই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ডেঙ্গু চিকিৎসার সুযোগ এবং সরকারি সহায়তা বাড়ানো এখন জরুরি বলে আমরা মনে করি।
সরকারের এটা মনে রাখা দরকার, শুধু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার প্রস্তুতি দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। জনগণকে সম্পৃক্ত করে জীবাণুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এখনই বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।