ভারতের রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের খুব কাছেই অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। মসজিদের ধূসর দেয়াল, খিলান এবং উঠানের সাদা-সবুজ টাইলসগুলো এখনো আগের মতোই অটুট থাকলেও, চারপাশের পরিবেশ এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। মসজিদের চারপাশে এখন কেবল ধ্বংসস্তূপের রাজত্ব। যে প্রাঙ্গণ আর বসতি একসময় মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত, সেখানে এখন এক নিস্তব্ধ শূন্যতা।
এই বসতিরই একজন বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী গাড়িচালক মোহাম্মদ ওয়াসিম। মসজিদের পাশে পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের দিকে আঙুল দেখিয়ে তিনি জানান, এখানেই একসময় তাঁর ঘর ছিল। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘এখানে আমার বাবার বিয়ে হয়েছিল। কয়েক দশক পর আমার মেয়ের বিয়েও এখানে হয়েছে।’
দিল্লির রেসকোর্স এলাকায় অবস্থিত এই বসতিতে ওয়াসিমের মতো আরও কয়েক শ মানুষ পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। এলাকাটি অত্যন্ত অভিজাত এবং কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত, যেখানে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা, অভিজাত ক্লাব এবং বিশাল সব বাংলো রয়েছে। এই চাকচিক্যের মাঝেই ছোট ছোট কিছু ঘর নিয়ে গড়ে উঠেছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের এই বসতি।
গত ৭ অক্টোবর কর্তৃপক্ষ সেখানে এক বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বাড়িঘর, দোকানপাট এবং অন্যান্য স্থাপনা। কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকারি জমিতে অবৈধভাবে এই বসতি গড়ে তোলা হয়েছিল, তাই তা অপসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টিও তারা সামনে এনেছে।
কয়েক প্রজন্ম ধরে এই এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন মুসলিম পরিবারগুলো। আশপাশের অভিজাত বাড়িগুলোতে তারা গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা মালির কাজ করে জীবন অতিবাহিত করতেন। মোট ৭১৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাদের বর্তমান ঠিকানা দিল্লির উপকণ্ঠে ‘সাভদা ঘেবরা’ নামের একটি আবাসিক এলাকা, যা আগের বসতি থেকে প্রায় ৩১ মাইল দূরে অবস্থিত।
এই উচ্ছেদের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দারা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তাঁদের প্রধান যুক্তি ছিল, কর্মস্থল, সন্তানদের বিদ্যালয় এবং পরিচিত সামাজিক পরিবেশ থেকে এত দূরে সরিয়ে নেওয়া হলে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। তবে আদালত এই যুক্তিগুলো গ্রহণ করেননি। গত আগস্টে আদালত তাঁদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি প্রদান করেন। সরকার নিরাপত্তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল এবং আদালত তা গ্রহণ করে বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয়।
ব্যাপক এই উচ্ছেদ অভিযানের পর পুরো এলাকাটিতে কেবল মসজিদটি এবং কাছাকাছি থাকা একটি মন্দির অক্ষত রয়েছে। তবে মসজিদের পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং যাতায়াতের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মুসল্লিদের মসজিদের ফটক থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যদিও কেউ কেউ নিরাপত্তারক্ষীদের অনুরোধ করে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন।
মসজিদের পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ পুনরায় চালু করার জন্য ওয়াক্ফ বোর্ড কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, নামাজ আদায়ে বিধিনিষেধ এবং স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কা করে একজন মুসল্লি হাইকোর্টে মামলা করেছেন।
মসজিদটি শতাব্দীপ্রাচীন বলে মনে করা হয়। ভারত সরকারের দাবি, এটি সরকারি জমিতে নির্মিত। তবে মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৯৭৭ সালে এটি ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। ইসলামি আইন অনুযায়ী, ধর্মীয় বা দাতব্য কাজের জন্য স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করা জমি বা স্থাপনাকে ওয়াক্ফ সম্পত্তি বলা হয়। এছাড়া এটি একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবেও তালিকাভুক্ত।
দিল্লি ওয়াক্ফ বোর্ডের তথ্যমতে, মসজিদটির বয়স প্রায় ৩০০ বছর। যদিও অনেকের মতে এর বয়স ১২৫ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সব মিলিয়ে এটি একটি শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা।
গত ২৯ অক্টোবর সরকার আদালতকে জানিয়েছে যে, ওয়াক্ফ বোর্ডের আপত্তিগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে এবং আগামী চার সপ্তাহ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নামাজ আদায়ের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সরকার বিরোধিতা করেছে। তাদের যুক্তি, আশপাশে উচ্ছেদের কাজ চলমান থাকায় সেখানে নামাজ পড়া ঝুঁকিপূর্ণ। মুসল্লিদের আইনজীবী সরকারের এই যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছেন।
সমালোচকদের মতে, দিল্লিতে এই ধরনের উচ্ছেদ নতুন কিছু নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার অংশ। নিম্ন আয়ের মানুষ যারা কাজের সন্ধানে শহরে আসেন, তাদের বারবার শহরের প্রান্তিক এলাকায় ঠেলে দেওয়া হয়। এর মূল কারণ হলো, কয়েক দশক সেখানে বসবাস করলেও তারা জমির বৈধ মালিকানার প্রমাণ দেখাতে পারেন না।
আদালত এই বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে রাজি হননি এবং আগামী ১৬ ডিসেম্বর শুনানির পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছেন। মসজিদটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। একসময়ের বাসিন্দাদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন—পুরানো জীবনের কতটুকু আর ফিরে পাওয়া যাবে?
ওয়াসিম এখন সুযোগ পেলেই নামাজ পড়তে মসজিদে যান। কখনো নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে বাধা দেয়, আবার কখনো অনুমতি মেলে। চার-পাঁচজন মিলে নামাজ পড়েন তারা। মসজিদের বাইরে একটি বড় জেনারেটর বসানো হয়েছে, যার উচ্চশব্দে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ওয়াসিম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের পুরো জীবন এ জায়গাটি ঘিরে। শৈশবে এখানে খেলাধুলা করে বেড়ে উঠেছি। আমরা এখন কীভাবে জায়গাটি ছেড়ে যেতে পারি।’
রেখা নামে এক বিধবা নারীও দীর্ঘকাল এখানে বসবাস করেছেন। পাশের একটি বাড়িতে ধোয়ামোছার কাজ করে তিনি সংসার চালাতেন এবং স্থানীয় মন্দিরে সেবায়েতের কাজ করতেন। উচ্ছেদের পর তিনি এখন দিশেহারা। অসহায় কণ্ঠে রেখা বলেন, ‘বেশ কয়েক দশক এখানে ছিলাম। এখন উচ্ছেদ করা হলো। বহুদিনের গোছানো সংসার ফেলে এখন নতুন জায়গায় গিয়ে আবার কীভাবে সব গড়ে তুলব?’
নতুন জায়গায় স্থানান্তরের ফলে রেখা তাঁর কাজ হারিয়েছেন। তাঁর ১৯ বছর বয়সী ছেলে এখন চাকরির সন্ধানে ঘুরছেন। রেখাকে তিনতলায় একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্ট দেওয়া হয়েছে। তবে পায়ে লোহার পাত পরানো থাকায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠিত রেখা বলেন, ‘আমাকে একটা বাসা দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার বাড়িটি কেড়ে নিয়েছে।’
নগর গবেষক মুক্তা নায়েক বিবিসিকে জানান, উচ্ছেদের ফলে এই মানুষগুলো কর্মস্থল এবং সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা—উভয় থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এতে তাঁদের জীবিকা নষ্ট হয় এবং আয় কমে যায়। পুরোনো জায়গায় দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সহযোগিতার যে নেটওয়ার্ক ছিল, নতুন জায়গায় তা গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। মুক্তা বলেন, ‘নতুন জায়গায় পরিবারগুলোকে একাই নিজেদের সবকিছু সামলাতে হয়।’
দিল্লির রাজ্য সরকারের আবাসন সংস্থা, স্থানীয় পৌর কাউন্সিল এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমি দপ্তরের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও বিবিসি কোনো জবাব পায়নি।
সাভদা ঘেবরা এলাকাটি দিল্লি-হরিয়ানা সীমান্ত সংলগ্ন। ২০০৬ সালে বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে এটি গড়ে তোলা হয়েছিল যাতে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করা যায়। শুরুতে এখানে আসা মানুষগুলো কেবল খালি জমি পেয়েছিলেন; রাস্তা, পানি বা বিদ্যুতের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সময়ের সাথে সাথে তারা নিজেদের ঘরবাড়ি ও দোকান তৈরি করেছেন এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধার জন্য লড়াই করেছেন।
চলতি শতকের শুরুর দিকে এখানে প্রায় হাজার পঞ্চাশেক মানুষ বাস করতেন। এখন রেসকোর্স থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো সেখানে নতুন করে জীবন গড়ার কঠিন যাত্রা শুরু করেছে। বাবলু নামের এক বাসিন্দা জানান, তাঁর সন্তান এখনো আগের বিদ্যালয়েই পড়ছে। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বের হয়ে মেট্রোতে তিনবার ট্রেন বদলে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যেতে হয়। স্কুলের সময়টুকু তিনি পাশের চায়ের দোকানে অপেক্ষা করেন এবং একইভাবে বাড়ি ফেরেন। বাবলু বলেন, নতুন বাড়িটি অনেক দূরে হওয়ায় তাঁর বা তাঁর স্ত্রীর সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে বিকেল চারটে বেজে যায়।
রেসকোর্সের একটি ক্লাবে কাজ করা বাবলু এখন মিরাট শহরে কাজ খুঁজছেন। তিনি জানান, অনেকেই কর্মস্থল এবং সন্তানদের বিদ্যালয়ের কাছাকাছি চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তবে সরকারের দাবি, রেসকোর্সের কাছাকাছি উপযুক্ত ফ্ল্যাট পাওয়া যায়নি। আদালতে সরকার জানিয়েছে, সাভদা ঘেবরায় চিকিৎসাকেন্দ্র, বিদ্যালয় ও যোগাযোগব্যবস্থা থাকায় এটি বসবাসের জন্য উপযুক্ত।
কিন্তু ৬৩ বছর বয়সী নাঈম খান এই সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে আশ্বস্ত নন। তাঁর দুই নাতি কথা বলতে ও শুনতে পারে না, যাদের বিশেষায়িত চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রয়োজন। নাঈমের দাবি, সাভদা ঘেবরায় তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। স্থানান্তরের ফলে তাঁর পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এক ছেলে ও বিবাহবিচ্ছিন্ন মেয়ে তাঁর সাথে এক কক্ষের ফ্ল্যাটে থাকলেও অন্য দুই ছেলেকে আলাদা জায়গায় থাকতে হচ্ছে। নাঈমের ভাষায়, ‘আমাদের প্রায় ২০ বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
নগর গবেষক মুক্তার মতে, এই বাস্তুচ্যুতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নারীদের ওপর। শিশুদের দেখাশোনা, যাতায়াত খরচ এবং নিরাপত্তার কারণে দূরে গিয়ে কাজ করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে তারা ধনী পরিবারগুলোতে থালাবাসন ধোয়া, বাগান পরিচর্যা বা বোতল কুড়িয়ে আয় করতে পারতেন।
আখতারি নামের এক বিধবা নারী আগে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে দিনে প্রায় ১০০ রুপি আয় করতেন। এখন সেই আয়ের পথ বন্ধ। নতুন বসতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখানে যাঁরা থাকেন সবাইকে একসময় উচ্ছেদ করা হয়েছে। সবাই গরিব, অসহায়। নিজেরা টিকে থাকার লড়াই করছেন। অন্যের বাসায় কাজের জন্য কে আর কাউকে নিয়োগ দেবে?’
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয় এখন তাঁকে তাড়া করে। আখতারি বলেন, ‘ঘরে মৃত পড়ে থাকলেও কেউ জানতে পারবে না। আশা করি কেউ একদিন দরজা ভেঙে আমাকে (মৃত অবস্থায়) খুঁজে পাবে।’