জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে দেশের প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর। আগামী ১০০ বছরের হিসেবে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের এই মোট ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি: সহনশীল ভবিষ্যতের জন্য কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক এশিয়া প্যাসিফিক ক্লাইমেট প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক আর্থিক ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গত বুধবার এই প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
এডিবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্রবন্দরগুলোর পরিচালনাগত সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে। এর ফলে বন্দরের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
প্রতিবেদনটিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষতির একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে ভারত, যাদের সমুদ্রবন্দরগুলোর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে ২৫৪ বিলিয়ন ডলার। ৩৮ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ এবং চতুর্থ অবস্থানে শ্রীলঙ্কা, যাদের আর্থিক ক্ষতি হবে ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের। তালিকার সবশেষে থাকা মালদ্বীপের ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
জাতিসংঘের জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়নে যুক্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ঝুঁকি বাড়ছে দুই দিক থেকে। একদিকে উপকূলীয় ভূমির অবনমন (সাবসিডেন্স) হচ্ছে। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বদ্বীপ হওয়ার কারণে এমনিতে আমাদের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা বেশি না।’
অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম আরও উল্লেখ করেন যে, উপকূলে বিদ্যমান ১৬২টি পোল্ডার নির্মাণের সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যদিও সরকার বর্তমানে জলবায়ুসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে উন্নত দেশগুলো অভিযোজন খাতে প্রতিবছর ৩৫০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তার কথা বলেছিল। তবে বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে উপকূলীয় এলাকায় বন্যার প্রবণতা বৃদ্ধি, তীব্র পানির সংকট এবং ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে সেখানকার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হবে। এডিবির প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে শুধুমাত্র বাংলাদেশেই ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হঠাৎ আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ যেভাবে দ্রুত ঘরবাড়ি হারায়, এই বাস্তুচ্যুতির প্রক্রিয়াটি হবে অনেক ধীরগতির। ফলে এই ধরনের সমস্যাগুলো তেমন গুরুত্ব পায় না। এর ফলে পরিবার ও সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও হারিয়ে ফেলে।
এডিবির তথ্যমতে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন উপকূলে বসবাস করেন। এই অঞ্চলের উপকূলে মোট ৪০ কোটি মানুষের বাস। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনসংখ্যা বেড়েছে ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। একই সময়ে ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে জনসংখ্যা বেড়েছে ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ১০ শতাংশ।
মাঝারি শহরগুলোর অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে প্রতিবেদনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের যেসব এলাকা বন্যায় তলিয়ে যায়, সেখানে বসতি আরও বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চট্টগ্রামের এই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবকাঠামো বেড়েছে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে নগরের মোট নির্মিত এলাকার আয়তন বেড়েছে ১১ দশমিক ২ শতাংশ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আখতার মাহমুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী ১১টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। তার মধ্যে চট্টগ্রাম হলো একটি। এটি পাহাড়ি অঞ্চল। অতিবৃষ্টির সময় একসঙ্গে প্রচুর পানি নেমে আসে, একই সময়ে সমুদ্রের পানিও বেড়ে যায়। ফলে চট্টগ্রামের বিশাল এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের সৃষ্ট কারণে চট্টগ্রামের ঝুঁকি বাড়ছে।