ভারতের নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক রেস কোর্স মসজিদের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে প্রায় ৭০০টি পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। এদের প্রায় সবাই মুসলিম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, মসজিদের সামনে বেশ কয়েকটি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, সরকারি উদ্যোগে ইতিমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে একাধিক বাড়িঘর। এর আগেই মসজিদ ও সংলগ্ন এলাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জরুরি পরিষেবা, ঝোলানো হয়েছে উচ্ছেদের নোটিশ। প্রশাসনের পদক্ষেপ ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ভারতের একাধিক রাজ্য থেকেই সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রশাসনের বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি বনভূমি দখলমুক্ত করতে আসামের তিনটি জেলায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বাধীন সরকার।
রাজ্য প্রশাসনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক সপ্তাহের মধ্যে ৬৩৮ হেক্টরের বেশি জায়গা মুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে এক হাজারের বেশি পরিবার ভিটাছাড়া হয়েছে। এসব পরিবারও মুসলিম। কলকাতায়ও বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর একটি মুসলিম–অধ্যুষিত কলোনিতে পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ–সংযোগও আগে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল, তবে তা আবার চালু করা হয়েছে।
আগামী ধাপে একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে পূর্ব ভারত থেকে উত্তর ভারত সর্বত্রই মুসলিমদের বাড়িঘর, দোকানপাট এবং মসজিদ ইত্যাদি আবার নতুন করে ভাঙা শুরু হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন দিল্লির ‘ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস’ (এলঅ্যান্ডডিও) প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসস্থানের কাছে অবস্থিত ওই মসজিদের জমিকে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেছে। সেখানে যেকোনো ধরনের অননুমোদিত দখল বা বেআইনি নির্মাণকে আইনত অপরাধ বলে ঘোষণা করে একটি সতর্কতামূলক নোটিশও টাঙানো হয়েছে।
এই নোটিশে কেন্দ্রীয় গণপূর্ত বিভাগ বা সিপিডব্লিউডি-কে নির্দেশ কার্যকরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল (এনডিএমসি)-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ মেনেই ওই এলাকায় উচ্ছেদ ও পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করার কাজ চলছে। ৭ অক্টোবর থেকে মসজিদসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, দিল্লির তুঘলক রোড থানা পুলিশ কোনো ধরনের ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংবাদ সংস্থা ‘সিয়াসত ডটকমের’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মসজিদ বা নিকটবর্তী কোনো বাসস্থান ভেঙে ফেলা হয়নি বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই থানার এক কর্মকর্তা।
ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ নয়, বরং ১৫-১৬ কিলোমিটার দূরে মুন্ডকা এলাকায় তাঁদের জন্য বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানেই তাঁদের যেতে বলা হয়েছে। যদিও, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ভিডিও চিত্রে মসজিদের সামনে ইটের স্তূপ ও ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে নিবন্ধিত এবং গ্রেড-২ ঐতিহ্যবাহী স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে তালিকাভুক্ত রেস কোর্স মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় ৮০০ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের ইমাম বলেছেন, তাঁদের মাত্র ছয় দিনের মধ্যে জায়গা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনি পদক্ষেপ নিতে তিনি দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের কাছে অনুরোধ করলেও কোনো সাড়া পাননি।
বিষয়টি এখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানিসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সত্ত্বেও বহু কষ্টে নিরাপত্তাবেষ্টনী এড়িয়ে কয়েকজন মুসল্লি সেখানে গিয়ে নামাজ আদায় করেছেন। তাঁরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এই নিষেধাজ্ঞাকে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অধিকারের ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন।
এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে স্থানীয় ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। তাদের অভিযোগ, আসাম থেকে দিল্লি—সর্বত্র দখলদার উচ্ছেদের নামে বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিমদের লক্ষ্য করেই অভিযান চালাচ্ছে প্রশাসন।