চ্যাম্পিয়ন্স লিগের আগের ম্যাচে পিএসজির কাছে পরাজয়ের ধাক্কায় কিছুটা চাপে ছিল বার্সেলোনা। তবে সেই হতাশার স্মৃতি মুছে ফেলে দাপুটে জয়ের মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন করল হান্সি ফ্লিকের শিষ্যরা। ঘরের মাঠে ইংলিশ ক্লাব অ্যাস্টন ভিলাকে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছে কাতালান জায়ান্টরা। এই জয়ের মূল কারিগর হয়ে দাঁড়িয়েছেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রাফিনিয়া, যার জোড়া গোল দলের জয় নিশ্চিত করে। অন্য একটি গোল করেছেন তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামাল। এই গোলের মাধ্যমে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নতুন এক ইতিহাস গড়েছেন এই স্প্যানিশ কিশোর।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে ক্যাম্প ন্যুতে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বের চতুর্থ ম্যাচে মুখোমুখি হয় বার্সেলোনা ও অ্যাস্টন ভিলা। ম্যাচের শুরুতেই ইয়ামালের গোলে স্বাগতিকরা এগিয়ে যায়। প্রথমার্ধে আর কোনো গোল না হলেও, বিরতির পর রাফিনিয়ার জোড়া গোলে বড় জয় নিশ্চিত করে বার্সা। এই পরাজয়ের ফলে চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অ্যাস্টন ভিলার শতভাগ জয়ের রেকর্ড ভেঙে গেছে।
তবে ম্যাচ শুরুর আগে মাঠজুড়ে ছিল শোকের পরিবেশ। স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব তেনেরিফের ফুটবলার হেসুস দে মিগুয়েলের মৃত্যুর ঘটনায় তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। শোক প্রকাশের অংশ হিসেবে প্রথাগত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পরিচিত সংগীতটিও বাজানো হয়নি ম্যাচের আগে।
বৃষ্টিভেজা ক্যাম্প ন্যুতে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল প্রদর্শিত করে বার্সেলোনা। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে সুযোগের সন্ধানে ছিলেন ইয়ামাল ও রাফিনিয়ারা। মাত্র সপ্তম মিনিটেই সেই প্রচেষ্টার ফল পায় স্বাগতিক দল।
নিজেদের বক্সের কাছে বল বের করতে গিয়ে মারাত্মক ভুল করেন ভিলার ফুটবলাররা। গোলরক্ষক জিওন সুজুকির পাস পাওয়ার পর মিডফিল্ডার জোয়াও গোমেস অসতর্কভাবে বল বাড়ান। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে জড়ান ইয়ামাল। শুরুতেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বার্সেলোনা।
এই গোলেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম খোদাই করলেন ১৯ বছর বয়সী ইয়ামাল। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে ২০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড এখন তার দখলে। ইউরোপের এই শ্রেষ্ঠ প্রতিযোগিতায় কিশোর বয়সেই ১৪ গোল পূর্ণ করলেন তিনি। এর আগে ১৩ গোল নিয়ে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে।
শুধুমাত্র গোলের রেকর্ডই নয়, আরও একটি মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ইয়ামাল। কিশোর বয়সে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ ৩৭ ম্যাচ খেলার রেকর্ডেও ওয়ারেন জাইরে-এমেরির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বার্সেলোনার এই তারকা।
তবে শুরুতে গোল হজম করলেও সহজে হাল ছাড়েনি উনাই এমেরির দল অ্যাস্টন ভিলা। দ্রুত সমতায় ফেরার চেষ্টা করে তারা। পাল্টা আক্রমণে বেশ কয়েকবার বার্সেলোনার রক্ষণভাগকে বিপদে ফেলে সফরকারীরা। ম্যাটি ক্যাশের একটি প্রচেষ্টা অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। অন্যদিকে নিকোলাস জ্যাকসনের বিপজ্জনক আক্রমণ রুখতে গোলপোস্ট ছেড়ে এগিয়ে আসতে হয় বার্সা গোলরক্ষক জোয়ান গার্সিয়াকে।
প্রথমার্ধে আরও কয়েকবার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েন গার্সিয়া। জোহান মানজাম্বির একটি প্রচেষ্টা তিনি দক্ষতার সাথে ঠেকিয়ে দেন। পাশাপাশি ভিলার বেশ কিছু আক্রমণ রুখে দেন বার্সেলোনার ডিফেন্ডাররাও। তবে সুযোগ পেয়েও সমতায় ফিরতে ব্যর্থ হয় সফরকারীরা।
অন্যদিকে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল বার্সেলোনাও। তবে রাফিনিয়া ও অ্যান্থনি গর্ডনের প্রচেষ্টা থেকে গোল আসেনি। বিশেষ করে গর্ডনের একটি শট দারুণ দক্ষতায় রুখে দেন ভিলা গোলরক্ষক সুজুকি। ফলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় হান্সি ফ্লিকের দল।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের হাতে নেয় বার্সেলোনা। বিরতির পর সপ্তম মিনিটেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন রাফিনিয়া। ফেরমিন লোপেজের পাস পেয়ে বক্সের ভেতর থেকে শট নেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। ভিলার ডিফেন্ডার পাউ তোরেসের গায়ে লেগে বলের গতিপথ বদলে যাওয়ায় গোলরক্ষক সুজুকির কিছু করার ছিল না।
দুই গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষের ওপর ক্রমাগত চাপ বজায় রাখে তারা। বিপরীতে দ্রুত গোল শোধ করার চেষ্টা করলেও কোনো সুবিধাই করতে পারছিল না ভিলা।
ম্যাচের ৬৪তম মিনিটে আবারও জ্বলে ওঠেন রাফিনিয়া। এই গোলটিতে বড় অবদান রাখেন জোয়াও কানসেলো। বাঁ প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে জন ম্যাকগিনকে কাটিয়ে পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে এক দুর্দান্ত পাস দেন পর্তুগিজ ডিফেন্ডার। সেই পাসের সুযোগ নিয়ে খুব কাছ থেকে বল জালে জড়িয়ে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের তৃতীয় গোলটি করেন রাফিনিয়া।
এই জোড়া গোলের মাধ্যমে বার্সেলোনার হয়ে আরও একটি মাইলফলক স্পর্শ করেন এই ব্রাজিলিয়ান তারকা। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ক্লাবটির জার্সিতে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৪। এর ফলে বার্সার সাবেক কিংবদন্তি রোনালদিনহো ও হোসে মারিয়া বাকেরোর গোলসংখ্যা স্পর্শ করেছেন তিনি।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও রাফিনিয়ার পারফরম্যান্স ছিল চোখ ধাঁধানো। অপটার তথ্য অনুযায়ী, বার্সেলোনার হয়ে এই প্রতিযোগিতায় তার গোল সংখ্যা এখন ২৩টি। এর মাধ্যমে রবার্ট লেভানডফস্কির সমান গোল করলেন তিনি। বার্সার হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রাফিনিয়ার চেয়ে বেশি গোল করেছেন কেবল লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজ।
তৃতীয় গোলের পরেও আক্রমণ থামায়নি বার্সেলোনা। ফেরমিন লোপেজের একটি প্রচেষ্টা দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন ভিলার গোলরক্ষক সুজুকি। ইয়ামালও আরও গোলের সুযোগ তৈরি করেন, তবে শেষ পর্যন্ত ব্যবধান আর বাড়েনি।
অন্যদিকে ৬৯ মিনিটে গোলের দারুণ একটি সুযোগ পেয়েছিল অ্যাস্টন ভিলা। কর্নার থেকে লিওন গোরেৎসকার নেওয়া হেডে বল পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফলে অন্তত একটি গোল শোধ করার সুযোগ হাতছাড়া হয় সফরকারীদের।
ম্যাচে জয়ের পাশাপাশি রক্ষণভাগের পারফরম্যান্স কোচ হান্সি ফ্লিককে স্বস্তি দিয়েছে। টানা ১৮টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচে গোল হজমের পর এবার নিজেদের জাল অক্ষত রাখতে পেরেছে বার্সেলোনা। অর্থাৎ ১৯ ম্যাচ পর এই প্রতিযোগিতায় প্রথম ক্লিনশিট পেল কাতালানরা।