আইসক্রিমের দোকানে গিয়ে আমরা যখন ভ্যানিলা ফ্লেভারের আইসক্রিম চাই কিংবা কেকের দোকানে ভ্যানিলা ফ্লেভারের কেক খুঁজি, তখন আমরা আসলে এক অনন্য সুবাসের কথা ভাবি। আইসক্রিম থেকে শুরু করে পারফিউম—নানা ধরনের পণ্যে ভ্যানিলার ফ্লেভার বা সুবাস ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে আইসক্রিম ও কেকের মতো বেকারি পণ্যের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে ভ্যানিলা এখন অনেকের কাছেই দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের কৃষি খাতের জন্য সুখবর হলো, এখন বাংলাদেশেও ভ্যানিলার বাণিজ্যিক উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। ২০১৯ সালে বগুড়ায় অনেকটা শখের বশে পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যানিলার চাষ শুরু হয়। বর্তমানে বগুড়ার পাশাপাশি ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বেশ কিছু স্থানে উদ্যোক্তারা ভ্যানিলা চাষ করছেন। যদিও চাষিরা এখনো পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে পৌঁছাতে পারেননি, তবে সম্ভাবনা প্রবল। বর্তমানে বিশ্ববাজারে এক কেজি ভ্যানিলার দাম ২৫০ ডলারের (প্রায় ৩০ হাজার টাকা) কাছাকাছি।
একটি অবাক করা তথ্য হলো, আমরা সাধারণত বিভিন্ন পণ্যে যে ভ্যানিলা ফ্লেভার ব্যবহার করি, তার অধিকাংশ আসলে কৃত্রিম ভ্যানিলা, যা পরীক্ষাগারে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়। বাংলাদেশেও এই কৃত্রিম ভ্যানিলাই আমদানি করা হয়। প্রাকৃতিকভাবে ভ্যানিলার উৎপাদন অত্যন্ত নগণ্য এবং এই দামি মসলাপণ্যের প্রাকৃতিক উৎপাদন বিশ্বের মাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশে কেন্দ্রীভূত।
ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভ্যানিলার বৈশ্বিক বাজার বর্তমানে ৪১০ কোটি ডলারের বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৪ সাল নাগাদ এই বাজার ৬৭০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রতি বছর ভ্যানিলার বাজার ৬ শতাংশের বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভ্যানিলা মূলত এক ধরনের মসলাপণ্য। বর্তমানে এটি সহজলভ্য মনে হলেও এর পেছনের ইতিহাস মোটেও সাধারণ নয়। আমেরিকা মহাদেশের গহিন জঙ্গল থেকে এটি বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর সাথে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস। উদ্ভিদতাত্ত্বিকভাবে ভ্যানিলা হলো একটি লতানো অর্কিড-জাতীয় গাছের ফল, যা ভ্যানিলা বিন বা ভ্যানিলা পড নামে পরিচিত। কাঁচা ভ্যানিলা ফলে নিজস্ব কোনো ঘ্রাণ থাকে না। ফলগুলো পরিপক্ব হলে গাছ থেকে সংগ্রহ করে দীর্ঘ সময় ধরে বিশেষ প্রক্রিয়াকরণ করা হয়, যার ফলে সেই বিশেষ সুগন্ধ তৈরি হয় এবং সেখান থেকে ভ্যানিলা নির্যাস সংগ্রহ করা হয়।
বাংলাদেশে এই যাত্রার শুরু হয় ২০১৯ সালে বগুড়ায়। বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু হেনা ফয়সাল ফাহিম পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যানিলা চাষ শুরু করেন। নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি মুক্তকণ্ঠকে জানান, ২০১৯ সালে মসলা বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে তিনিসহ একদল গবেষক ইন্দোনেশিয়ায় যান। সেখানে তাঁরা ভ্যানিলা চাষ সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান লাভ করেন। পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া থেকে ভ্যানিলা গাছের একটি কাটিং (কলম বা চারা) এনে মসলা গবেষণা কেন্দ্রে রোপণ করেন ফয়সাল ফাহিম। এরপর ওই গাছ থেকে আরও কাটিং বা কলম তৈরি করে নতুন গাছ রোপণ করা হয়। বর্তমানে সেখানে ৩ শতক জায়গায় ৬০টি ভ্যানিলা গাছ রয়েছে।
প্রাকৃতিক ভ্যানিলা উৎপাদন ও রপ্তানিতে বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কার। বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশনের (ডব্লিউআইটিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাদাগাস্কার প্রায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের ভ্যানিলা রপ্তানি করে।
পরবর্তী কয়েক বছরে ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ কয়েকটি স্থানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্বল্প পরিসরে ভ্যানিলা চাষের চেষ্টা চালানো হয়। এমনকি ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যানিলা নিয়ে গবেষণা করছেন। তবে এখন পর্যন্ত দেশে কেউ বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন শুরু করতে পারেননি।
ভ্যানিলা চাষের পদ্ধতি বেশ জটিল। এটি সাধারণ মাটিতে হয় না; এর জন্য অর্গানিক ডিকম্পোজড মিডিয়া তৈরি করতে হয়। এছাড়া প্রয়োজন হয় শেডের। ছায়াযুক্ত বাগানে বিভিন্ন গাছের নিচেও এটি করা যায়, তবে শেড পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া যায়।
একটি ভ্যানিলার চারা রোপণের দুই থেকে তিন বছর পর ফুল আসতে পারে। প্রতিটি ফুলের থোকায় ১৩ থেকে ১৮টি ফুল থাকে, যা সাধারণত মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই পরাগায়ন সম্পন্ন হতে হয়। বাণিজ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরাগায়নের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা থাকে। পরাগায়নের পর ফল আসতে এবং তা পরিপক্ব হতে আরও সাত থেকে আট মাস সময় লাগে। সাধারণত এপ্রিলে ভ্যানিলা গাছে ফুল আসে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে ফল পরিপক্ব হয়।
ফল সংগ্রহের পর দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শুকানোর কাজ বাকি থাকে। প্রথমে ফলগুলোকে ৬০ ডিগ্রি গরম পানিতে ৩ মিনিটের জন্য রাখা হয়। এরপর ২৪ ঘণ্টা একটি বাক্সের মধ্যে ফারমেন্টেশন বা গাঁজনের জন্য রাখা হয়, যার ফলে সবুজ ভ্যানিলা বিন কালো রং ধারণ করে। পরবর্তী এক মাস নিয়ম করে প্রতিদিন সকালবেলা মৃদু আলোয় দুই ঘণ্টা করে রোদে শুকানো হয়। এভাবে ভ্যানিলার নির্যাস প্রস্তুত হয়, যা থেকে পরবর্তীতে স্বাদ ও সুগন্ধির উপাদান বের করা হয়। তবে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে এই নির্যাস বের করার পদ্ধতি এখনো নেই।
ভ্যানিলার সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ১০ কোটি ডলারের ভ্যানিলা আমদানি করে।
বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফয়সাল ফাহিম বলেন, ‘বাংলাদেশের আবহাওয়া ভ্যানিলা চাষের জন্য উপযোগী, তা প্রমাণিত হয়েছে। তবে ভ্যানিলা চাষ অত্যন্ত শ্রমঘন এবং প্রাথমিক খরচের দিক থেকে উচ্চ বিনিয়োগের ফসল। ৫০ শতক জমিতে ১ হাজার গাছের বাণিজ্যিক প্রকল্প নিতে প্রাথমিকভাবে ন্যূনতম ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। ফলে বাণিজ্যিকভাবে এটি লাভজনক হবে কি না, সেটি যাচাইয়ের পরেই আমরা সরকারিভাবে কৃষকদের কাটিং সরবরাহ করতে পারব।’
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে ভ্যানিলা চাষে বিনিয়োগ করেছেন। তাঁরা ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কাটিং আনিয়েছেন এবং উদ্যোক্তারা একে অপরকে কাটিং দিয়ে সহায়তা করছেন। এমনই একজন উদ্যোক্তা যশোরের মো. সারোয়ার হোসেন। তিনি আম ও ড্রাগন চাষের পাশাপাশি ছায়াবৃত্ত ক্যানোপি পদ্ধতি ব্যবহার করে ভ্যানিলা চাষ শুরু করেছেন। চার বছর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে শুরুতে কিছু গাছ হারালেও বর্তমানে তাঁর বাগানে প্রায় ১৫০টি ভ্যানিলা গাছ বেড়ে উঠছে।
সারোয়ার হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ভ্যানিলা হবে না—এ রকম কোনো জায়গা নেই। এখন দরকার উৎপাদন বাড়ানো। দেশে যদি ১০০ জন কৃষককে প্রয়োজনীয় ভ্যানিলা কাটিং দেওয়া হয়, তাহলে চার থেকে পাঁচ বছর পর এক হাজার কেজি ভ্যানিলা বিন রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। তখন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এমনিতেই বাংলাদেশে আসতে শুরু করবে।’
ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ভ্যানিলার বৈশ্বিক বাজার ৪১০ কোটি ডলারের বেশি এবং ২০৩৪ সালে তা ৬৭০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা প্রতি বছর ৬ শতাংশ হারে বাড়ছে। জাফরানের পর ভ্যানিলাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় দামি মসলা মনে করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম অত্যন্ত চড়া। বিভিন্ন গ্রেডের ভ্যানিলার মধ্যে কয়েক বছর আগে গড় দাম ছিল ৫৫০ ডলার (প্রায় ৫০ হাজার টাকা), যা বর্তমানে কমে ২৫০ ডলারের (৩০ হাজার টাকা) আশপাশে দাঁড়িয়েছে। কৃত্রিম ভ্যানিলার উৎপাদন বৃদ্ধি এই দাম কমার অন্যতম কারণ।
খাদ্য ও পানীয় শিল্পে ভ্যানিলার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। কেক, বিস্কুট, মাফিন, পেস্ট্রির পাশাপাশি আইসক্রিম, দই, কাস্টার্ড, ফ্লেভারড দুধ, ক্যান্ডি, চকলেট ও বিভিন্ন দানাদার খাবারে এটি ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সুগন্ধি, প্রসাধনী ও ওষুধশিল্পেও এর চাহিদা রয়েছে। তবে অধিকাংশ পণ্যে প্রাকৃতিক বিনের বদলে কৃত্রিম ভ্যানিলাই ব্যবহৃত হয়।
ভ্যানিলিন হলো ভ্যানিলার প্রধান সুগন্ধি যৌগ, যা শিল্পপদ্ধতিতেও তৈরি করা যায়। বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম ভ্যানিলার ব্যবহার ব্যাপক। তাই ভ্যানিলা বিনের বাজার, প্রাকৃতিক নির্যাস এবং কৃত্রিম ভ্যানিলিনের বাজারকে আলাদা করে দেখতে হয়। প্রতিবেদনে উল্লিখিত আমদানি-রপ্তানির তথ্যগুলো প্রাকৃতিক ভ্যানিলার। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট ভ্যানিলা ফ্লেভারের ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশই হলো কৃত্রিম ভ্যানিলা।
বিবিসি জানায়, বর্তমানে বাণিজ্যে শীর্ষস্থানে থাকলেও ভ্যানিলার উৎপত্তি মাদাগাস্কারে হয়নি। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার জঙ্গলে। ভ্যানিলার এই ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস নিয়ে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাবেক সাংবাদিক টিম ইকোট ২০০৪ সালে ‘ভ্যানিলা: ট্রাভেলস ইন সার্চ অব দ্য লাশাস সাবস্টেন্স’ নামে একটি বই লিখেছেন।
বইটিতে টিম ইকোট বলেন, বর্তমান মেক্সিকোর পাপান্তলা অঞ্চলের টোটোনাক আদিবাসীরা প্রথম ভ্যানিলা চাষ শুরু করেন। ১৫ শতকে অ্যাজটেক জাতি টোটোনাক আদিবাসীদের পরাজিত করে পাপান্তলা এলাকা জয় করে এবং তাদের চকলেট-জাতীয় বিশেষ পানীয়র স্বাদ বাড়াতে ভ্যানিলা ব্যবহার শুরু করে। পরবর্তীতে স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে অ্যাজটেক সম্রাটদের ভ্যানিলা ও চকলেট স্পেনে পৌঁছায় এবং দ্রুতই ইউরোপের রাজকীয় মসলায় পরিণত হয়। এরপর অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোও এই চাষে আগ্রহী হয় এবং একপর্যায়ে এটি ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাকৃতিক ভ্যানিলা রপ্তানিতে মাদাগাস্কারের পর রয়েছে ফ্রান্স, জার্মানি, উগান্ডা ও কানাডা, যাদের বার্ষিক রপ্তানি দেড় থেকে চার কোটি ডলার। নেদারল্যান্ডস ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানিও এক কোটি ডলারের বেশি। অন্যদিকে আমদানির তালিকায় ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, ইতালি ও সুইজারল্যান্ড সামনে রয়েছে। এই দেশগুলো মূলত ভ্যানিলা বিন আমদানি করে প্রক্রিয়াজাত নির্যাস তৈরি করে পুনরায় রপ্তানি করে, তাই তারা আমদানি ও রপ্তানি উভয় তালিকায় স্থান পেয়েছে। প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, উগান্ডা, মেক্সিকো, পাপুয়া নিউগিনি, ভারত, কমোরোস ও তানজানিয়া। এছাড়া ফরাসি পলিনেশিয়ার তাহিতি বিশেষ ধরনের ভ্যানিলা উৎপাদনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।